13/08/2025
রাজুমামা বলেছিলেন―বুঝলি, তোদের মামির সঙ্গে আমার যে বিয়ে হয়েছিল, এর মূলে কিন্তু ছিল পবিত্র খাসি।
খাসির মাংসের প্রেমে মানুষ বাঙালি একাধিকবার পড়তে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে প্রেম-বিবাহের কী সম্পর্ক?
রাজুমামা বললেন―গল্পটা শুনলেই বুঝবি।
সেদিন মামির রান্না লুচি আর মাটন কষা খেতে খেতে যা শুনেছিলাম আপনাদের বলি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস আপনাদের হাতে।
রাজুমামা আমার বড়মামার পাড়ার বন্ধু। চ্যাম্পিয়ন খাইয়ে ছিলেন, শুনেছি। একবার বাজি ফেলে পঁচিশটা ডিম-ভরা পাবদা খেয়েছিলেন। মেনুতে ছিল পাবদা সর্ষে। ঝোল-টোল সব পড়ে ছিল। পাবদা উধাও।
একটা বয়স পেরোলে বাঙালির মন উড়ু-উড়ু হয়ে ওঠে। তখন সে কবিতা লেখে। হবু প্রেয়সীকে চিঠি পাঠানোর চেষ্টা করে। রাজুমামারও পাড়ার একজনকে ভালো লাগত। কিন্তু তাতে কী? সামনে যে পাহাড়সমান বাধা! পাত্রীর বাবা অপরেশবাবু পুলিশে চাকরি করতেন। রিটায়ার করেছেন সদ্য। আর দাদা সমরেশ, হাইকোর্টের উকিল। নতুন প্র্যাকটিস শুরু করেছে।
রাজুমামার কবিতা-টবিতা আসে না। তিনি সামান্য ইংরেজির মাস্টার। তাই মনের দুঃখে দু-প্লেট ফিশ ফিঙ্গার একাই খেয়ে নেন। খেতে খেতে নিজেকে বড় একা লাগে তাঁর। দু-একবার লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। উত্তরও পেয়েছিলেন। মনে হয়েছিল, মেয়েটি তাকে বেশ পছন্দই করে। কিন্তু উকিল-পুলিশের ভয়ে আর এগোননি। বাবাগো! যদি জেলে ভরে দেয়?
কপালে যদি প্রেম লেখা থাকে, তাহলে তা আটকানোর সাধ্য কারো নেই। রাজুমামারও কপাল খুলল অপ্রত্যাশিতভাবে।
সেবার সমরেশের বিয়ে। পাড়াসুদ্ধু সকলের ডাক পড়েছে। এলাহি আয়োজন। লুচি, পোলাও, কষা মাংস, মাছের ছড়াছড়ি। অপরেশবাবু নাকি নিজে বাছাই করে নিয়ে এসেছেন রেওয়াজি খাসি। পাড়ার সকলে খেয়ে ধন্য ধন্য করছে।
এদিকে কনের বাড়ির লোকেরা একেবারেই খেতে পারেন না। তাঁরা সদলবলে এসেও এক পিস করে মাংস নিয়েছেন। পোলাও-এর হাঁড়ি ঘুরিয়ে আনতেই তাঁরা হাঁহাঁ করে উঠছেন। তাঁদের দেখে অনেকেই লজ্জটজ্জা পেয়ে কম খাচ্ছেন। একজন তো বলেই দিলেন―হজমের ট্যাবলেট এনেছি গো! দুটো লুচির বেশি খেতে পারব না।
রাজুমামাও বেশি খাননি। কেবল ১০ পিস মাংস। আঁচিয়ে, পান মুখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তিনি সমরেশের সমবয়সী। ফলে তাঁকেও বাসর জাগতে হবে। বুকে দুঃখ চেপে খোশগল্প করতে হবে।
শেষ ব্যাচ খেয়ে ওঠার পর দেখা গেল দু’বালতি মাটন কষা পড়ে আছে। আর এক হাঁড়ি পোলাও। সেসময়ে তো এমন বাড়ি বাড়ি ফ্রিজ ছিল না। কনের বাড়ির পেটরোগা লোকেরাও ছাঁদা বাঁধতে রাজি নন। অত পোলাও-মাংস খাবে কে?
অপরেশবাবুর মাথায় হাত। কত সাধ করে রেওয়াজি খাসি এনেছেন। এখন সেসব ফেলাছড়া যাবে? কুকুর বেড়ালে খাবে?
রাজুমামা গোটা ব্যাপারটা দেখছিলেন। তিনি গিয়ে আমতা আমতা করে বললেন―আমি কি একটু চেষ্টা করব?
অপরেশবাবু রাশভারী গলায় বললেন―কী চেষ্টা করবে?
রাজুমামা মিনমিনে গলায় বললেন―ওই একটু মাংস…
অপরেশবাবুর কী মনে হল। বললেন―দেখো…
রাজুমামা পাত পেড়ে আবার খেতে বসলেন। দুরুদুরু বুকে মা-কালীকে স্মরণ করে মাংসের বালতিতে হাত দিলেন।
তার পরের ঘটনাটা, সেদিন সেখানে যারা উপস্থিত ছিল, তারা আজও জনে জনে বলে বেড়ায়। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। রাজুমামার ওপর সেদিন বোধহয় বকরাক্ষস ভর করেছিল। মাত্র ঘণ্টা খানেকের মধ্যে একবালতি মাংস আর পোলাও উধাও। একটা প্রকাণ্ড ঢেঁকুর তুলে অন্য বালতি থেকে মাংস তুলে নিলেন রাজুমামা। অপরেশবাবু তো গলে জল। তিনি এগিয়ে এসে নিজে পরিবেশন করছেন। তাঁর স্ত্রী বাতাস করছেন। রাজুমামা যখন থামলেন তখন সব ফাঁকা। শুধু তার পাতে জমে আছে হাড়ের বিরাট একটা পাহাড়।
অপরেশবাবু আবেগের চোটে মামার এঁটো হাত দুটোই ধরে ফেললেন।
বললেন―আমায় তুমি বাঁচালে বাবা, রাজেশ্বর! বলো কী করব তোমার জন্য!
রাজুমামা মিনমিন করে বললেন―আজ্ঞে দুটো টিউশনি করতাম। গতমাসে একটা গেছে। যদি একটা টিউশনি…
অপরেশবাবু যেন হাতে চাঁদ পেলেন। বললেন―এতো সামান্য ব্যাপার। তুমি ইংরেজি পড়াও না? আমার মেয়ে বুলটি― সবে কলেজে উঠল। ইংরেজিতে ভীষণ কাঁচা। ওকে তুমি একটু ব্যাকরণ-ট্যাকরণগুলো দেখিয়ে দিও। সপ্তাহে তিন দিন আসবে। পড়াবে। বাড়ির ছেলের মতোই জলখাবার খাবে। আর মাসে মাসে দু’হাজার টাকা নিও। কেমন?
সেই থেকে বাঘের গুহায় মামার প্রবেশ ঘটল। আর বছর ঘুরতেই সরকারি কলেজে ভালো চাকরিও পেলেন রাজুমামা।
তারপর? তারপর চার-হাত এক হওয়া ঠেকায় কে! ওঁদের বিয়েতেও নাকি পাড়াশুদ্ধ সকলে খেয়েছিল। মেনুতে যে মাটন কষা ছিল, বলাই বাহুল্য।
আপনার পরিচিতদের মধ্যে কি এমন রাজুমামাদের দেখেছেন? কমেন্টে জানান আমাদের।