22/02/2021
গল্প:- ডেলিভারি বয়
-সোমশুভ্র সরকার
-অনির্বাণ'দা আজ শরীরটা কেমন একটা করছে, জ্বর জ্বর, মাথা ব্যাথা! আমার মনে হয় কি জানো তো, কাল সেই কাঁপার ওর্ডারটা ছেড়ে দিলেই ভালো হতো! এই ঠান্ডায় রাত দশ'টায় হাই রোডে গাড়ি চালানো মানে কঠিন ব্যাপার! মনে হয় কুয়াশার জঙ্গলে সাঁতার কাটছি!
-আর সেজন্য তুমি আজ ডুব দেবে? আশ্চর্য! দশ বারোটা ডেলিভারি এখনই পরে গেছে! তুমি না থাকলে কি করে হবে? আজও কাঁপায় ডেলিভারি আছে! প্রায় সাতটা মটন বিরিয়ানি!
-ওরে বাবা! আবার সেই কাঁপা! অনির্বাণ'দা আমার শরীরটা কাঁপছে বুঝলে! একশো সারে দুই জ্বর! আমি ঘুমালাম! গুড মর্নিং!
অনির্বাণের মাথায় বেজায় চাপ! এমনিতেই প্রতিদিনই নিত্য নতুন চাপের মুখে পরে সে! একদিন পার্শ্ব চাপ, একদিন নিম্ন চাপ! তবে অনির্বাণের কাজটা বেশ চ্যালেঞ্জের! মাত্র চার ঘন্টায় দশ কেজি চালের বিরিয়ানি বিক্রি করতে হবে! আর বিরিয়ানিই একমাত্র এমন খাবার, যেটা রাত পোহালে আর খাওয়া যায় না! অর্থাৎ হয় বিক্রি, নয় নষ্ট! একদিন রান্নার লোক আসতে দেরি করে, তো একদিন ওই অদ্ভুত মতন গাড়ির ড্রাইভারটি! একদিন গ্যাস ফুরায় তো একদিন সারা সপ্তাহের দামি দামি সব মশলা ফুরায়! একদিন গাড়ি বিগড়ায়, একদিন বিগড়ায় অনির্বাণের মা! অনির্বাণের মা একেবারেই মধ্যবিত্ত পরিবারের গিন্নি মানুষ অর্থাৎ বুঝতেই পারছেন গলাটা একটু বেশি! ডেলিভারি বয় আসবে না শুনে, অনির্বাণের মা অনির্বাণের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো,
-বলেছিলাম! বলেছিলাম এতো আগে থেকে ওর্ডার নিস না! একটাও কথা শুনিস না! মায়ের কথা বাসি হলে কাজে লাগে!
-বিরিয়ানি বাসি হলে খাওয়া যায় না মা!
-তা এবার ডেলিভারি গুলো কি পাখি উড়ে উড়ে দিয়ে আসবে?
-আমি যাবো ডেলিভারি দিতে! তুমি আর সমর গাড়িতে থেকো!
-তোকে বেশি পোদ্দারি করতে বলিনি! নৈহাটি কাঁচড়াপরা সব জায়গায় সাইকেলে ডেলিভারি দিবি?
-কি আর করবো? আমার তো আর ডানা নেই।
-তুই পড়তে বস! সরকারি চাকরিটা কিন্তু তোমায় পেতে হবে! সামনে রেলের না ব্যাঙ্কের কিসের একটা ফর্ম বেরচ্ছে, ডাব্লু-বি-সি-এস দিবি না?
-ডেলিভারির মধ্যে সরকারি চাকরি এলো কোথা থেকে মা?
-তুই সবাইকে না করে দে! সাইকেলে করে অতো দুর দুর যেতে হবে না!
-মা আজকের দিন টাই তো শুধু! কাল থেকে রেল ব্যাঙ্ক সব হবে!
-যাও না যাও! সাইকেল নিয়ে একবার কাঁচড়াপারা পোদের ছাল চামড়া সব উঠে যাবে!
-সে আমি ম্যানেজ করে নেবো! আসলে শেষে যদি বিক্রি না হয় নষ্ট হয়ে যাবে জিনিসটা!
অনির্বাণ কনো মতে তার মা'কে রাজী করিয়ে, খাশির মাংস, মুরগির মাংস এবং যাবতীয় মশলা কিনে, আরও ওর্ডার নিতে থাকলো! কাছাকাছি কিছু অর্ডার দুপুরে ডেলিভারি দিয়ে, স্নান করে, খেয়ে দেয়ে, প্রমোশান মার্কেটিং করে, ভগোবানের কাছে শ্রদ্ধার্গ দিয়ে, ছ'টার সময় নৈহাটির পাঁচটা বিরিয়ানি ডেলিভারির উদ্দেশ্যে বেরোলো অনির্বাণ,
-হ্যাঁ দাদা! টমজেরি বিরিয়ানি থেকে বলছিলাম, আমি নৈহাটি পাওয়ার হাউস মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি! আমি এবার কোন দিকে আসবো?
-ওহ হ্যাঁ! এক সেকেন্ড! একজনকে কনফারেন্সে নিয়ে নি!
-আচ্ছা ঠিকাছে!
-হ্যাঁ দুষ্টু! এই দ্যাখো ডেলিভারি বয় চলে এসেছে! এবার আমলা হান্ডি বিরিয়ানি খাবো!
-ও দাদা বাড়িটা কোন দিকে? আমি মোরে দাঁড়িয়ে আছি!
-আমিও খাবো! আমিও খাবো!
-আমি বাড়ি না পৌঁছালে কি করে খাবেন ম্যাডাম! বাড়িটা কোন দিকে?
-কি গো! বাড়িটা কোন দিকে জিজ্ঞাসা করছে তো!
-তুমি বলে দাও না! আমার বাড়ির ঠিকানাটা আমার থেকে তুমি ভাল মনে রেখেছো সোনা!
-দাদা আমি কুড়ি কিলোমিটার পথ এসেছি সাইকেল নিয়ে, দয়াকরে বলবেন আপনার বাড়ির পথ কোনটা?
-ওহ আই সি! যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন তার উল্টো দিকে একটা ওষুধের দোকান, পাশের রাস্তাটা দিয়ে আসুন! বাঁ দিকে আসুন এবার..তারপরে ডান দিকে!
-আসলাম! এরপর?
-আপনি তো দেখছি রকেট স্পিডে সাইকেল চালান! পাশে দেখুন একটা ব্যাকা ল্যাম্ফপোস্ট আছে!
-দাদা এখানে কোন ল্যাম্ফ পোষ্ট নেই!
-ওহ হো! আপনি মনে হয়ে এক নম্বর গলিটা দিয়ে ঢুকে গেছেন! আপনাকে দু'নম্বার গলি দিয়ে ঢুকতে হতো! টুম্পা দুষ্টুটা তুমিও এই একই ভুল করেছিলে প্রথমদিন মনে আছে?
-আমি ব্যাকা ল্যাম্ফ পোষ্টের কাছে দাঁড়িয়ে আছি!
-বাবা আপনি তো দেখছি রকেট স্পিডে সাইকেল চালান! দেখুন বা'দিকে দু'টো বাড়ি পরে, সামনে একটা দেওয়ালে লেখা আছে "বিজ্ঞাপন মারিবেন না!" ওই বাড়িটার কাছে আসুন!
-দাদা এসে গেছি!
-আপনার কত হলো?
-ফাইভ নাইনটি ফোর!
-হ্যাঁ দুষ্টু! আমি নিয়ে নিয়ে নিয়ে বিলিয়ানি! আমলা এখন বিলিয়ানি খাবো!
-নমস্কার ম্যাডাম! টমজেরি বিরিয়ানি থেকে বলছি! আপনার তিনটে চিকেন বিরিয়ানি ওর্ডার ছিল!
-হ্যাঁ হ্যাঁ!
-আপনার এড্রেসটা একটু বলবেন?
-আপনি কোথায় আছেন?
-আমি নৈহাটি পাওয়ার হাউস মোড়ে!
-আপনি তালপুকুর আসুন! বেশ্যা গলির পাশ দিয়ে সোজা এসে গলিতে দাঁড়ানো যে কাউকে জিজ্ঞাসা করুন, রানীর বাড়ি যাবো, দেখিয়ে দেবে!
অনির্বাণ যথারীতি সাইকেলের হ্যান্ডেলে বিরিয়ানী ঝুলিয়ে ঢুকলো বেশ্যা গলির পাশের গলি! দু'পাশে চেয়ারে কিছু মহিলা অতিরিক্ত মেকাপ করা মুখটা চুন করে বসে আছে! ব্যবসায় সবারই কাস্টোমার চাই! অনির্বাণ কারো দিকে চোখ না দিয়ে, গলির শেষ প্রান্তে গিয়ে একটা মাতাল পাগলকে জিজ্ঞাসা করলো,"দাদা এখানে রানী কে আছে?" পাগল ফিক্ করে হেসে উত্তর দিল,"এখানে তো সবাই রানী! আমিও রানী!" অনির্বাণ আবার ফোন করলো কিন্তু রানী তার ফোন ধরলো না! অনির্বাণ পরলো বড় বিপদে! বেশ্যাখানা যেটা একটা আনকম্ফরট্যাবেল প্লেস, তার মধ্যে রানীকে খোঁজা! পাশে ল্যাম্ফ পোষ্টের নিচে লাল সারি পরে দাঁড়ানো একজন মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলো,
-বলছি! এখানে রানীর ঘর কোনটা?
-কেন হে ছোকরা? আমার মধ্যে কিছু কম আছে নাকি? অন্ধকার ঘরে আমিই রানী, নামে কিছু যায় আসে না!
-আমি বিরিয়ানি দিতে এসেছি! সেই হালিসহর থেকে সাইকেল চালিয়ে! বলো না প্লিজ রানীর ঘর কোনটা? আজ আরো অনেক ডেলিভারি আছে!
-সেই হালিসহর থেকে সাইকেলে করে রানীর জন্য বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিস! কেন রে ভালোবাসিস রানীকে?
-ক্যাশ অন ডেলিভারি! মাল দেবো টাকা নেবো! আপনি কি জানেন রানীর ঘর? জানলে বলুন!
-এই দুটো ঘর পরে!
-ধন্যবাদ!
-আর হ্যাঁ! আমার জন্যও বিরিয়ানি আনিস, করতে দেবো!
অনির্বাণ উক্ত মহিলার কথায় কান না দিয়ে, রানীর ঘরে গিয়ে টোকা দিতেই রানী বেরলো দরজা থেকে! খোলা-মেলা পোশাক! সেই অতিরিক্ত মেকাপ নেই তবে কটকটে লাল লিপ্সটিকটা আছে।
-আপনার মোট বিল হয়েছে, চারশো সত্তর টাকা!
-আচ্ছা! আপনার চিনতে অসুবিধা হয়নি তো?
-না না ম্যাডাম! ভাল লাগলে আবার অর্ডার করবেন, টমজেরি হাজির হয়ে যাবে!
অনির্বাণ যখন নৈহাটি থেকে বেরবে তখন বাজে রাত আঁটটা! টানা পঁয়ত্রিশ মিনিট রকেট স্পিডে সাইকেল চালালে হালিসহর পৌঁছানো যাবে! সেখান থেকে হাড়ি তুলে টানা পয়তাল্লিস মিনিট রকেট স্পিডে সাইকেল চালালে কাঁপা পৌঁছানো সম্ভব! অনির্বাণ তাড়াতাড়ি করে হালিসহর পৌঁছালো সাইকেল নিয়ে রওনা দিল কাঁপার উদ্দেশ্যে! হালিসহর এবং কাঁচড়াপারার মধ্যে এক কিলোমিটার মতন একটা ফাঁকা রাস্তা আছে যার নাম ভূতবাগান! নাম শুনেই কেমন ভয় ভয় লাগে! ভূতেদের বাগান! তার উপর শীতের রাত, আরও ফাঁকা! সোজা সাইকেল চালিয়ে এক নিঃশ্বাসে কাঁচড়াপারা। রেলগেট পার করে মিনিট পনেরো সাইকেল চালিয়ে যখন, হাইরোডে গিয়ে উঠলো, অনির্বাণ থতমত খেয়ে গিয়েছিল একেবারে! দু'দিকে জঙ্গল, পুকুর এবং নিচু খাই মাঝে কালো পিচের রাস্তা! একটাও ল্যাম্ফ পোষ্ট নেই! একটাও মানুষ নেই! বড় বড় হেড লাইটওয়ালা গাড়ি আলোর বেগে ভয়ঙ্কর শব্দ সামনে দিয়ে বেরচ্ছে! এই সময় গাড়ির ভেতরে কানে হেডফোন লাগিয়ে অরিজিত সিং-এর গান শুনতে ভালই লাগে, কিন্তু অনির্বাণ তখন সাইকেল নিয়ে তার উপর বিরিয়ানির বোঝা! অনির্বান হাইরোডের এক সাইড দিয়ে ধিরে ধিরে এগোচ্ছে। রাস্তার উপর কুয়াশার আস্তরণ কাঁটছে সাইকেলের সামনের চাকার মাধ্যমে, পেছনের চাকাটা আবার কুয়াশাগুলোকে জুড়ে দিচ্ছে! বেশ কনেকনে ঠান্ডা! দশ হাত দুরে, কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার সমুদ্রে নৌকারূপী সাইকেল নিয়ে কাঁপা মোরে হাজির সে। সেখানে অনেক আলো আছে! ট্রাফিক পুলিশ দু'টো আছে বটে কিন্তু তারা ঝিমোচ্ছে! একটা মাতাল মোরে দাঁড়িয়ে গান করছে,"সকলই তোমারই ইচ্ছা! ইচ্ছাময়ী তারা তুমি!" সামনে মাতালটাকে দেখে দুটো পাগল কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে! অনির্বাণ মোবাইল বের করে দেখলো, রাত প্রায় ন'টা বাজে। ফোন করলো উক্ত কাস্টোমারকে,
-ম্যাডাম আপনার বাড়িটা কোন দিকে? আমি কাঁপা মোরে দাঁড়িয়ে আছি!
-আপনি কাঁপা মোর থেকে সোজা আসুন! বলুন রামকৃষ্ণ কলোনি। ওখানে এসে ফোন করুন!
-আমি আসছি! কতক্ষন লাগবে?
-পাঁচ মিনিট!
কিছুটা সাইকেল চালিয়ে, অনির্বাণ রাস্তার ধারে এক চা'বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলো,
-ও দাদা! রামকৃষ্ণ কলোনি কোন দিকে!
-সোজা চালাতে থাকো কুড়ি মিনিট ধরে!
-উনি যে বললেন পাঁচ মিনিট!
-কোন উনি?
অনির্বাণ রাস্তা ধরে সোজা সাইকেল চালাতে থাকলো। যত সামনে যেতে থাকলো আলোটা আবার কমতে থাকলো! ঘর বাড়ির সংখ্যা কমতে থাকলো! আপশোসের সাথে সাইকেল চালাতে চালাতে অনির্বাণ ভাবলো,"সকালে কার মুখ দেখে যে সে উঠেছে! ওর্ডারটা ক্যানসেল করলেই ভাল হতো! ডেলিভারি বয়টা সাধে ডুব দেয়নি!" সাইকেল চালাতে চালাতে অনির্বাণ লক্ষ্য করলো সে ধিরে ধিরে শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে প্রবেশ করছে! হঠাৎ গা'টা ছমছম করে উঠলো তার! শিতের রাত, প্রায় সারে ন'টা! জনমানবহীণ রাস্তা! রাস্তার দু'পাশে ধানের ক্ষেত! গাড়ির সংখ্যাও প্রায় শূন্য! আসে পাশে কেউ নেই যে জিজ্ঞাসা করবে, পলাশীর রাস্তা কোনটা! যেমন চিন্তা তেমন কাজ! হঠাৎ এক লোকের দেখা! ছ'হাত সামনের কুয়াশার চাদরের মধ্যে থেকে উদয় হলেন তিনি!
-দাদা পলাশির রাস্তা কোনটা?
-আপনি অনেক সামনে চলে এসেছেন!
-পেছনে দু'টো মোর পর যেতে হবে, তারপর বা'দিকের রাস্তা ধরবেন!
-বেশ ধন্যবাদ!
উক্ত মোরে এসে অনির্বাণ ফোন করলো উক্ত কাস্টোমারকে!
-হ্যাঁ আমি রামকৃষ্ণ মোর চলে এসেছি। এবার কোন দিকে?
-বা'দিকের রাস্তা!
-ম্যাডাম আর কতক্ষন লাগবে?
-আর পাঁচ মিনিট!
-আচ্ছা আমি আসছি!
-ও দাদা! পলাশি পঞ্চায়েত কোন দিকে?
-এখনো কুড়ি মিনিট!
-ম্যাডাম এখানের লোকগুলো সবাই কুড়ি মিনিট বলছে!
-না না আর পাঁচ মিনিট!
-ম্যাডাম আপনি ঠিক করে বলুন! আমি আগে তো এদিকটা আসিনি! আর আমার ডেলিভারি বয়টাও আজ কাজে আসেনি!
-আর পাঁচ মিনিট বাবু! খুব খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি এসো! অনেকের কাছে তোমাদের কথা শুনেছি! খুব খাবার ইচ্ছা!
-আচ্ছা যাচ্ছি ম্যাডাম!
অনির্বাণের একটাই দোষ! সে কাস্টোমার হাত ছাড়া করতে চায় না! বাড়ি থেকে বহু দুরে চলে এসেছে সে সাইকেল নিয়ে। তাকে আবার ফিরতেও হবে! ঘরিতে পৌনে দশটা। কনকনে শিতের রাত! কুয়াশার গুহায় যেন প্রবেশ করছে যে! কনকনে হাওয়ায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে কুয়াশা গুলো দুলছে! একটা প্রাণের চিহ্ন নেই সেখানে! সামনে একটা অদ্ভুত দেখতে কালো ষাঁড় আখাম্বা লম্বা দুটো সিং নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! অনির্বাণ সাইকেল জোড়ে চালাতে লাগলো, হৃদস্পন্দন বেরে গেল! ষাঁড়টাকে পের করতেই অদ্ভুত ভাবে ষাঁড়টা পিছু নিল! কারণহীন ষাঁড়ের ধাওয়া খেয়ে জনমানবহীন রাস্তায় সাইকেল ছোটাতে লাগলো! হঠাৎ সাইকেলের চেন পরে গেল! অনির্বাণ দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালো! ষাঁড় উধাও! আবারও বেশ ভয় পেল সে। কোন মতে চেন তুলে ফোন করলো কাস্টোমারকে! কাস্টোমারকে এবার বেশ রাগের সাথে অনির্বাণ বললো,
-আমি প্রায় পনেরো মিনিট ধরে সাইকেল চালাচ্ছি!
-আপনি প্রায় চলেই এসেছেন! আর মাত্র দু'মিনিটের রাস্তা!
-আপনি ফোনে থাকুন! বলুন, কোথায়?
-আপনি চালাতে থাকুন!
-আমি আগে এত দুর জানলে ওর্ডারটা ক্যান্সেল করতাম!
-আমার খুব খিদে পেয়েছে! বিরিয়ানি খাবো!
-আমি দু'মিনিট ধরে সাইকেল চালাচ্ছি!
-সামনে দেখুন, একটা পুরনো বড় কুয়ো আছে!
-হ্যাঁ! পাশে পলাশি পঞ্চায়েত!
-দেখুন পাশ দিয়ে একটা সরু গলি ঢুকে যাচ্ছে!
-হ্যাঁ! সোজা ঢুকলাম!
-একটু পরে দেখুন একটু পুরনো কালি মন্দির আছে!
-হ্যাঁ আছে!
-মন্দিরের সামনে দাঁড়ান! আপনি চলে এসেছেন!
-ধন্যবাদ ম্যাডাম! আপনার ডেলিভারি চার্জ অনেক হবার কথা! আপনি যা ভাল বুঝবেন দেবেন! রাত দশটাও বেঁজে গেল! কখন বাড়ি ফিরতে পারবো কে জানে? ম্যাডাম..!! আর ইউ লিসিনিং..?
-তুমি জুতো'টা খুলে মন্দিরে ঢোকো! আমি আর বেরতে পারবো না!
-ম্যাডাম আপনি বাইরে আসুন প্লিজ! আমি সু পরে আছি! মন্দিরে জুতো পরে ঢুকতে পারবো না।
-তুমি জুতো খুলেই ঢোকো! তুমি আমার ইচ্ছাতেই এসেছো! আমার ইচ্ছাতেই সব করবে!
-ম্যাডাম! এবার কিন্তু আপনি জোর করছেন আমায়!
-মনে আছে তুমি একটু আগে ভুল রাস্তায় গ্রামের দিকে চলে যাচ্ছিলে, একটা লোক এসে রাস্তা বললো, তাকে আমিই পাঠিয়েছি। একটা ষাঁড় তাড়া করেছিল, ওটা আমারই ষাঁড়!
-ম্যাডাম! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি তো মহা বিপদে পরলাম।
-তুমি জুতো খুলে, মন্দিরে এসো!
অনির্বান শূন্য মাথায় ভয়ে ভয়ে জুতো খুললো! কাস্টোমার এত কিছু জানলো কি করে? ষাঁড়টা ওনার মানে! বিরিয়ানির হাঁড়ি নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলো অনির্বান! একটা কালি ঠাকুরের মন্দির! মন্দিরটা প্রায় অন্ধকার! চারদিকে সাদা কুয়াশা! দুর দুরান্তে একটাও লোক নেই! মন্দিরের ভেতরে কালি ঠাকুর বাদে আর কেউ নেই! লাল জিভটা যেন একটু বেশিই বাইরে বলে মনে হচ্ছে! চোখ দুটো একেবারে জীবন্ত। হাতে ধরা গলা কাটা একটা মানুষের মুন্ডু! অনির্বাণ সেদিন বুঝতে পারলো সে শুধু যে একমাত্র ভুতে ভয় পায় এমনটা নয়, সে ভগবানেও ভয় পায়! অনির্বাণ কালি ঠাকুরের মূর্তিটার দিকে একভাবে তাকিয়ে, কানে ফোন নিয়ে বললো,
-হ্যালো ম্যাডাম! আমি চলে এসেছি আপনি কোথায়?
-কালি ঠাকুরের সামনে বিরিয়ানির হাঁড়িগুলো রাখো!
-ম্যাডাম এবার আমার সত্যিই ভয় করছে!
-আমি এখনো অভুক্ত! একটু ভোগ দিয়ে যা!
এবার অনির্বাণের পিলে চমকে গেল! কথাটা যেন পুরো মন্দির জুড়ে গমগম করতে লাগলো! অনির্বাণ কেপে উঠলো! খুব ধীরে ধীরে, মাথা নিচু করে, কালি ঠাকুরের মূর্তিটার সামনে গেল। বিরিয়ানির হাড়িগুলো রাখলো মূর্তির সামনে! রেখে মাথা নিচু করে, কানে ফোন নিয়ে বললো,
-ম্যাডাম আপনার বিল হয়েছে, হাজার আশি টাকা। আর আঁশি টাকা ডেলিভারি চার্জ!
-আচ্ছা উঠে, পেছনে যা! প্রনামী বাক্স খোলা আছে! তোর যত লাগে নিয়ে নে!
-ম্যাডাম! সরি এই কাজটা করতে পারবো না! অনির্বাণ দশ মিনিট পর ফোনটা কেটে পকেটে ঢোকালো! মাথা নিচু করে প্রণাম করে কালি ঠাকুরে মুখটার দিকে তাকাতে যাবে, উপর থেকে লাল রঙের একটা বড়ো ফোটার তরল মতন কিছু একটা পরলো অনির্বাণের কপালে! অনির্বাণ আঙ্গুলে করে তুলে দেখলো, সে আর কিছু নয় মানুষের লাল রক্ত! অনির্বাণ কেদে ফেললো হঠাৎ-ই! সষ্টাঙ্গে প্রণাম করলো এবং মন্দির থেকে বেরিয়ে এলো! এসে ঘড়ির দিকে তাকালো! ঘরিতে মাত্র আটটা দশ! তার সামান্য অতীতে কাটানো জীবনের দু'ঘন্টা হঠাৎ-ই গায়বে হয়ে গেল তার জীবন থেকে।
গল্পটি কেমন লাগলো কমেন্টে জানাবেন..!! ভাল লাগলে লাইক করবেন! বহুদিন পরে গল্প পোষ্ট করলাম, সাপোর্ট পেলে এই ডেলিভারি বয়ের আরও কিছু গল্প শেয়ার করবো..!!