30/05/2017
বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, "বুদ্ধিমানরা কথা বলে, কারণ তাঁদের কিছু বলার আছে। বোকারা কথা বলে, কারণ তাঁরা ভাবে কিছু একটা বলতেই হবে!" কর্পোরেট জগত, রাজনীতির কারবারী আর রাষ্ট্র চায় নাগরিকরা যেন বেশি বেশি কথা বলে। আমরা অনেক আগেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছি। আমরা এখন একটি "কথা বলা জাতি"। আমাদের প্রাইভেসির সংজ্ঞা বদলে গেছে। আসলে নেই। যেহেতু আমরা অবিরত কথা বলছি। সোস্যাল মিডিয়ায় সারাক্ষণ কথা বলি। নিজের গোপন ভাবনা, ব্যক্তিগত অনুভূতি,সম্পর্কের রসায়ন, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং রাজনীতির অভিমত- সব আমরা বলে ফেলি এই প্ল্যাটফর্মগুলিতে। ভোর থেকে এক অন্তহীন ভারচুয়াল কথা বলার দুনিয়ায় ঢুকে পড়ি হোয়াটস অ্যাপ অন করেই! কর্পোরেট চায় আমরা বেশি কথা বলি, কারণ ভয়েস কল, ডেটা চার্জে তাদের লাভ হবে। রাজনীতি চায় আমরা কথা বলি। তাহলে কেউ আর অজানা মতবাদের থাকবে না। সবার মতবাদ জানা হয়ে যাবে। রাষ্ট্র চায় আমরা কথা বলি। কারণ তাহলে আর কেউ রহস্যময় আনুপ্রেডিক্টেবল নাগরিক থাকবে না। এরা চায় আমাদের জীবন যেন একটি খোলা বই হয়। যার কোনো পাতাই অপঠিত নেই বহির্জগতের কাছে। এটাই রাষ্ট্র, রাজনীতি আর কর্পোরেটকে সুবিধা করে দেয়। আমরা সোস্যাল হচ্ছি। প্রাইভেসি হারাচ্ছি। আমরা প্রায় সকলেই একে অন্যকে চিনে যাচ্ছি। জেনে যাচ্ছি। কিন্তু চিনছি মিথ্যা আচরণ দিয়ে। কারণ সোস্যাল মিডিয়া বা চ্যাটে আমরা নিজেদের সবথেকে ভালো ব্যবহারটাই করি। ইমেজ বিল্ডিং এর জন্য। আমরা শুনি কম। বলি বেশি।
এই জানা কথাগুলি কেন আবার বলতে ইচ্ছে হল? সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী নয়ডার রক্ষা গোপাল দেশে প্রথম হয়েছে। অনেকদিন পর এমন কেউ প্রথম হল যে আগামীদিনে উইপ্রো বা ইনফোসিসের ভাগ্যের সাথে নিজেকে জড়াবে না। কারণ সে হিউম্যানিটিজ নিয়ে ক্লাস টুয়েল্ফথে প্রথম হল। সায়েন্স নয়। যথারীতি সেও রিপোর্টারদের জানিয়েছে, যে কতক্ষণ পড়েছে... কে তার প্রিয় লেখক...কেন টেক্সট বই বেশি বেশি পড়তে হবে...। কিন্তু সবথেকে ইন্টারেস্টিং কথা বলেছেন তার স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা মোনালী সরকার। উনি বলেছেন, রক্ষার ইউনিক ব্যাপার হল, ও কথা কম বলে। ও শোনে অনেক বেশি। মন দিয়ে। কিন্তু বলে কম। শোনে বেশি বলে কম! তাই মনেও রাখে। রক্ষা জানিয়েছে সে পলিটিক্যাল সায়েন্সে অনার্স নেবে দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে। আর গতকাল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভরেকর রক্ষাকে ফোন করে অভিনন্দন জানানোর পর তার পলিটিক্যাল সায়েন্সে আগ্রহ শুনে হাসতে হাসতে বলেছেন, তুমি আগামীদিনে পলিটিক্সে এসো। তোমাদের দরকার। অত্যন্ত আশার কথা যে রক্ষা জানিয়েছে, সে রাজনীতি ভালবাসে। আসতেও চায় পড়াশোনার পর। সুসংবাদ।
আমরাও চাই। অন্তত এরকম শিক্ষিত শীর্ষ স্থান পাওয়ারা আসুক বেশি করে রাজনীতিতে। একটু ইনটেলিজেন্ট হোক আমাদের রাজনীতি। কারণ আমাদের নিজেদের মতোই আমাদের চারপাশের সমাজ এবং রাজনীতিও কম শোনে। বলে বেশি। তাই নন-ইনটেলিজেন্টদের সংখ্যা বেশি। এতে করে ক্ষতি কি হচ্ছে? সাউন্ড অফ সায়লেন্সের সুরটি আর আমাদের ভিতরে যাচ্ছে না! আমরা আর নিজের সঙ্গে কথা বলি না। আমরা রবীন্দ্রনাথের সেই গানটি ধ্রুবপদ করে নিয়েছি- আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইলো না কেহ......