09/09/2025
রান্না করা মাংসে রক্তাভ অবস্থা এবং তার খাদ্য রসায়ন।
রেস্টুরেন্ট গিয়ে তান্দুরি চিকেন অর্ডার করেছেন আথচ খেতে গিয়ে দেখলেন মাংসের হাড়ে লাল রক্ত। যারা রেস্টুরেন্টে খেতে যান তারা অনেকেই ভুলবশত মনে করেন রান্না করা মুরগির হাড়ের কাছে যে লাল বা গোলাপি রঙের ছোপ দেখা যায়, তা আসলে জমাট বাঁধা রক্ত। আর এই বিষয়টি বিশেষ করে ক্যাটারিং ও রেস্টুরেন্ট পরিষেবা গুলিতে প্রায়শই গ্রাহকদের গুরুতর অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়। শেফ দেড় ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যান্ত ট্রেসফুল (stressful) সঠিক জ্ঞান না থাকার দরুন। আসলে ব্যাপারটাকি তানিয়ে আজকে আলোচনা করবো।
শেফ হিসেবে আমার কাছে মনে হলো এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং অনুসন্ধান প্রয়োজন আছে। তথ্যগত ভাবে এটি অবলোকন করা এবং বোঝানো অত্যান্ত গুত্বপূর্ন্য একটি বিষয়। আসলে মাংসের হাড়ের রান্না করা ওই লাল অংশ মাংসটি কম রান্না হওয়া বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে হয় না। জানলে অবাক হবেন এটি আসলে মায়োগ্লোবিন (myoglobin) নামক পেশীকলার একটি প্রোটিনের স্বাভাবিক রাসায়নিক বিক্রিয়া। মুরগি রান্না করার সময়, এই মায়োগ্লোবিন অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অক্সিমায়োগ্লোবিন (oxymyoglobin) তৈরি করে, যা হাড়ের কাছে লাল বা গোলাপি আভা দেয় যা অনেক সময় দেখতে বেশ তাজা মনেহয়। এটি সাধারণত অল্পবয়সী মুরগির ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, কারণ তাদের হাড় বেশি ছিদ্রযুক্ত (porous) হয়। কিছু ক্ষেত্রে, আয়রন যৌগের উপস্থিতির কারণে এটি গাঢ় লাল বা অনেক সময় কালোও দেখাতে পারে।
মোদ্দাকথা হলো, মাংসটি খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ যদি তা সঠিক অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রায় (internal temperature) পৌঁছে থাকে। শেফ দেড় উদেশ্যে বলি মাংস সঠিকভাবে রান্না হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করতে সর্বদা একটি ফুড থার্মোমিটার ব্যবহার করুন; শুধুমাত্র রঙের উপর নির্ভর করবেন না। আমাদের রেস্টুরেন্ট গ্রাহকদের উদ্বেগ ইতিবাচক এবং তা পেশাদারিত্বের সাথে সমাধান করার জন্য এই বিষয়ে সঠিক জ্ঞান এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা অপরিহার্য। ভোক্তাদের এই বিষয়ে শিক্ষিত করার মাধ্যমে কেবল অভিযোগের সমাধান হবে না, বরং আমাদের ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষা এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা থাকবে।
আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা ও তথ্যসূত্র 🔬 আমার প্রদত্ত তথ্যের বাইরেও এই ঘটনার পেছনে আরও গভীর বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। প্রধানত দুটি কারণ এর জন্য দায়ী হাড়ের মজ্জা থেকে হিমোগ্লোবিন নিঃসরণ এবং মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন।
১. হাড়ের মজ্জা (Bone Marrow) এবং হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin)
মুরগির হাড়ের কাছে মাংসের গোলাপি রঙের জন্য সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো হাড়ের মজ্জা থেকে রঙ্গক (pigment) বেরিয়ে আসা। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পালিত মুরগি সাধারণত ৬-৮ সপ্তাহের মধ্যে কাটা হয়। এই অল্প বয়সে তাদের হাড় পুরোপুরি শক্ত বা ক্যালসিফাইড (calcified) হয় না এবং বেশ ছিদ্রযুক্ত (porous) থাকে। আর হাড়ের মজ্জা হলো লোহিত রক্তকণিকা তৈরির স্থান, যেখানে প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন থাকে। হিমোগ্লোবিনও মায়োগ্লোবিনের মতো একটি আয়রন-সমৃদ্ধ প্রোটিন যা রক্তকে লাল করে। হিমায়িত (frozen) অবস্থা থেকে অথবা সাধারণ অবস্থা থেকে যখন মুরগি রান্না করা হয়, তখন হাড়ের মজ্জার ভিতরে থাকা হিমোগ্লোবিন গরম হয়ে ছিদ্রযুক্ত হাড়ের দেওয়াল ভেদ করে বাইরের মাংসপেশীতে চলে আসে। এই হিমোগ্লোবিনই রান্না হওয়ার পরেও মাংসকে হাড়ের কাছাকাছি অংশে একটি স্থায়ী গোলাপি বা লালচে আভা দেয়। যেহেতু হিমোগ্লোবিন উচ্চ তাপমাত্রায়ও তার লাল রঙ পুরোপুরি হারায় না, তাই মাংস সঠিকভাবে রান্না হলেও এই রঙটি থেকে যেতে পারে।
২. মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক অবস্থা (Chemical States of Myoglobin)
মায়োগ্লোবিন হলো পেশীকলার একটি প্রোটিন যা পেশীতে অক্সিজেন সঞ্চয় করে। এর রঙ নির্ভর করে তার সাথে অক্সিজেন বা অন্য কোনো অণু যুক্ত আছে কিনা এবং এর আয়রনের জারণ অবস্থার (Fe2+ বা Fe3+) উপর। ডিঅক্সিমায়োগ্লোবিন (Deoxymyoglobin) অক্সিজেনবিহীন অবস্থায় এর রঙ বেগুনি-লাল হয়। অক্সিমায়োগ্লোবিন (Oxymyoglobin) অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে এটি উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে। কাঁচা মাংসে আমরা এই রঙটিই দেখি। মেটমায়োগ্লোবিন (Metmyoglobin) যখন মায়োগ্লোবিনের আয়রন পরমাণু জারিত হয়ে ফেরাস (Fe2+) থেকে ফেরিক (Fe3+) অবস্থায় চলে যায়, তখন এর রঙ বাদামী হয়ে যায়। মাংস পুরোনো হলে বা রান্না করার সময় সাধারণত এই পরিবর্তনটি ঘটে।
রান্না করার পরেও গোলাপি রঙ থাকার আরো কিছু কারণ হলো, যেমন কিছু গ্যাসের (যেমন কার্বন মনোক্সাইড বা নাইট্রিক অক্সাইড, যা গ্যাস ওভেন, গ্রিল বা তান্দুরি ভাটি থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে) উপস্থিতিতে মায়োগ্লোবিন অনেক বেশি তাপ স্থিতিশীল (heat-stable) হয় এবং তার গোলাপি রঙ ধরে রাখে। এই প্রক্রিয়াটি অনেকটা কিউরিং (curing) করা মাংস, যেমন হ্যাম বা বেকনের গোলাপি রঙের মতোই।
নিরাপত্তার চূড়ান্ত নির্ণায়ক হচ্ছে তাপমাত্রা, তার রঙ নয়। ভারতের খাদ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, FSSAI (Food Safety and Standards Authority of India), ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার (USDA) সহ বিশ্বের সমস্ত খাদ্য সুরক্ষা সংস্থা একমত যে মুরগির মাংসের লাল রক্তাভ রঙ তার সঠিক রান্নার নির্ভরযোগ্য সূচক নয়। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে FSSAI-এর মতে, রান্না করা মুরগির হাড়ের কাছে গোলাপি রঙ থাকাটা কোনো সমস্যা নয়, মুরগির মাংস নিরাপদ কিনা তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো ফুড থার্মোমিটার ব্যবহার করে এর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরীক্ষা করা। নিরাপদ তাপমাত্রা সূচক হলো মুরগির মাংসের সবচেয়ে পুরু অংশে, হাড় স্পর্শ না করে, থার্মোমিটার প্রবেশ করালে যদি তাপমাত্রা 74∘C (বা 165∘F) বা তার বেশি দেখায়, তবে মাংসটি খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ, যতই তার রঙ গোলাপি হোকনা কেন। 🍗
👉 তথ্যসূত্র (References):
📕সাধারণ নিয়মাবলী (Schedule 4 - FSS Act, 2006) FSSAI-এর ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অ্যাক্ট, ২০০৬-এর অধীনে Schedule 4-এ খাদ্য ব্যবসার জন্য সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি এবং স্যানিটারি প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা আছে। এতে স্পষ্টভাবে "সম্পূর্ণরূপে রান্না" (through cooking) করার কথা বলা আছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে তাপমাত্রা দ্বারা নির্ধারিত হয়, রঙ দ্বারা নয়।
🌐USDA Food Safety and Inspection Service (FSIS). (2019). The Color of Meat and Poultry. এখানে সরকারি ভাবে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে, কেন রান্না করা পোল্ট্রির রঙ গোলাপি থাকতে পারে এবং কেন তাপমাত্রাই নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
📑Suman, S. P., & Joseph, P. (2016). Myoglobin chemistry and meat color. Annual Review of Food Science and Technology, 7, 79-99. এই গবেষণাপত্রটি মায়োগ্লোবিনের রসায়ন এবং বিভিন্ন অবস্থায় মাংসের রঙের পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
📑Cornforth, D. (1994). Color—Its Basis and Importance. In Quality Attributes and Their Measurement in Meat, Poultry and Fish Products (pp. 34-78). Springer, Boston, MA. এই একাডেমিক অধ্যায়টি মাংসের রঙের পেছনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, বিশেষ করে হিমোগ্লোবিন ও মায়োগ্লোবিনের ভূমিকা নিয়ে বিশদ তথ্য প্রদান করে।
(Please Follow, likes, shears and comments) 🙏