15/04/2026
সজিবের শার্টটা নাকে কাছে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল সোমা। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগছে। ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে বায়ান্ন মিনিট। মিনিট দুয়েক আগে সজিব বাড়ি ঢুকেছে। পরনের শার্টটা খাটের ওপর ফেলে বাথরুমে শাওয়ার নিচ্ছে। ইদানীং তার ব্যস্ততা বেড়েছে। সোমাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারে না। জিজ্ঞেস করলে বলে, “আমি খুব জরুরি একটা কাজ করছি। এই মুহূর্তে তোমাকে কিছু বলতে পারব না।”
সে আগ বাড়িয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। স্বামী হিসাবে সজিব বেশ ভালো। তাকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না। সন্দেহ করা ঠিক হবে না– কথাটা শুধু মুখের। সোমা আজ-কাল তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। সজিব প্রায় দিনই বাড়ি ফিরতে দেরি করে। দশটা এগারোটা না। কখনো সখনো একটা দু'টো বেজে যায়। ওই রাতে ফিরে সে গোসল করে। কখনো ভাত খায়, কখনো খায় না। শুকনো মুখে বলে, “আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।”
কোথায় গিয়েছিলে? কেন দেরি হলো? এ জাতীয় প্রশ্নের কোন জবাব দেয় না সজিব। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। ক্লান্ত স্বরে বলে, “আজ আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কাল বলব।”
সোমার মন খারাপ হয়। সজিবের এই ব্যবহার একদম নতুন। এর আগে তারা দু'জন কত ভালো সময় কাটিয়েছে। তখন রাত নয়টার ভেতর সজিব বাড়িতে চলে আসত। দু'জনের মধ্যে নানান কথাবার্তা, খুনসুটি হতো। এখন আর সে-সব কিছু হয় না। আগের কথা ভাবতে সোমার চোখে পানি জমে যায়। মনে আনতে না চাওয়া একটা কথায় মাথার ভেতরে উঁকি দিতে থাকে। তবে কী সজিব অন্য কোথাও জড়িয়ে পড়ল? রোজ তার শার্টে যে মিষ্টি গন্ধ লেগে থাকে ওটা কী কোন মেয়ের পারফিউম? তার শরীরের গন্ধ? সোমা আর ভাবতে পারতে পারে না। চোখের পানি মুছে ঘুমানোর চেষ্টা করে। তার চোখে ঘুম নামে না। তিন বছরের সাজানো সংসারের ছন্নছাড়া রূপ দেখে কোন মেয়ের চোখেই বা ঘুম নামতে পারে?
আজ বিকেল থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। দেখে মনে হয় রাতে খুব ঝড়বৃষ্টি হবে। সোমা ছাঁদ থেকে কাপড় তুলে এনে বিছানার উপর রাখল। বালিশের পাশা রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে সজিবের নম্বরে কল দিলো। দু'বার রিং হওয়ার পর সজিব কল রিসিভ করল। সোমা বলল, “লাঞ্চ করেছ?”
“হ্যাঁ। মাত্রই শেষ করলাম।”
“আগে দুপুরের দিকে একবার কল দিতে। এখন তো আর সে সুযোগ পাও না।”
সজিব একটু লজ্জিত হলো। থতমত গলায় বলল, “অফিসে কাজের চাপ বেড়েছে সোমা। ফোন ধরার সুযোগ হয় না।”
“এই যে, এখন তো কথা বলছ।”
“হ্যাঁ। তা বলছি।”
“সুযোগ কখনো কারো হাতে থাকে না। মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ তৈরি করে নেয়। তোমার কাছে আমি পুরনো হয়ে গেছি। তাই সুযোগ তৈরি করা ইচ্ছে খুঁজে পাচ্ছো না।”
সোমা কল কে'টে দিলো। শেষ কথাগুলো বলতে তার গলা ধরে আসছিল। সোমার ছোট সংসার। ভাড়ার বাসা। শ্বশুর শাশুড়ি নেই। অনেক আগে মা'রা গেছে। গ্রামের বাড়িতে এক চাচা আছে। চাচার ছেলেপেলে আছে ক'জন। বিয়ের সময় তারা ছিল। তারপর আর তেমন যোগাযোগ নেই। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
এভাবে চলতে পারে না। সজিবের হঠাৎ এই ব্যস্ততা কিসের? কেন এমন করছে? সবকিছুর উত্তর দরকার। সজিব বাড়ি ফিরলে সোমা আজ তাকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে। উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যেতে দেবে না। কোনভাবেই না।
সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এখন রাত নয়টা। বৃষ্টি কমার নাম নিচ্ছে না। সোমা মোবাইল হাতে চেয়ারে বসল। সে বেশ কয়েকবার সজিবকে কল দিয়েছে। সজিব কল রিসিভ করছে না। কলিং বেল বাজছে। সোমা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। রতন দাঁড়িয়ে আছে। সজিবের কলিগ। আগেও বেশ কয়েকবার এ বাসায় এসেছে। সোমা তাকে দেখে হাসার চেষ্টা করল। রতন বলল, “ভাবী আপনার মহাশয় কোথায়? অফিসে ফাইল ভুলে রেখে এসেছে। সেই ফাইল দিতে এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আবার আমার আসতে হলো।”
“আপনাদের অফিস শেষ? না মানে সজিব এখনও বাড়ি ফেরেনি।”
“সেকি কথা! এখনও বাড়ি ফেরেনি? অফিস ছুটি হয়েছে বিকেল পাঁচটায়। এমনিতে ছয়টার দিকে ছুটি দেয়। আজ আকাশে মেঘ দেখে বড় স্যার আমাদের সবাইকে চলে যেতে বলেছে।”
“ওহ!”
“চিন্তা করবেন না ভাবী। সজিব ভাই মনে হয় বৃষ্টিতে কোথাও আটকে আছে।”
সোমা কিছু বলল না। একমনে দাঁড়িয়ে রইল। রতন বলল, “ভাবী, এই ফাইলটা একটু রাখেন। ভাই ফিরলে তাকে দিয়ে দেবেন। আমি একটু বাড়ি যেতে হবে। আপনাদের ভাবী গরম ভাত তরকারি নিয়ে বসে থাকবে। দেরি করা যাবে না।”
সোমা মুচকি হেসে ফাইল নিলো। দরজা লাগিয়ে চেয়ারে এসে বসল। হঠাৎই তার কিছু ভালো লাগছে না। বাসা থেকে সজিবের অফিসের দূরত্ব চার পাচ কিলোমিটার। এতটুকু আসতে এত সময় লাগার কথা না। তাহলে সজিব কোথায়? সোমা কল দিতে শুরু করল। কল ঢুকছে, কিন্তু কেউ কল রিসিভ করছে না।
সজিব ফিরল রাত বারোটার পর। ফিরেই বাথরুমে ঢুকে গেল। সোমা তার শার্টটা নাকের কাছে নিলো। মিষ্টি গন্ধটা আজ একটু বেশি। সজিব সময় নিয়ে গা গোসল শেষ করল। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল, “রাতে খাব না। বসে থাকতে হবে না। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।”
“ঘুমানোর আগে আমার কিছু জানার আছে।”
“সোমা, আমার ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। ঘুমতে চাই।”
সোমা সজিবের বাহু ধরে ফেলল। ঠিক সেই মুহূর্তে নজরে পড়ল– সজিবের ঘাড়ের কাছে লালচে একটা দাগ। সোমা বলল, “এটা কিসের দাগ?”
“পোকামাকড় কিছু একটা কামড়েছে।”
“নাকি অন্যকিছু? আর তুমি প্রতিদিন এত দেরিতে ফেরো কেন?”
“অফিসে কাজ থাকে। ওরা আমাকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেয় না।”
সোমার কিছু কঠিন কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল। এইভাবে ঝগড়াঝাটি করে কোন লাভ হবে না। যা করার সামনা-সামনি করতে হবে। সে ঠিক করল কাল থেকে সজিবের উপর নজর রাখবে। ঘরে তেমন কোন কাজ নেই। সব গুছিয়ে রাখতে তেমন অসুবিধা হবে না।
ঘরের কাজ বেশি না। তবুও সকাল থেকে সে খুব দ্রুত সব কাজ শেষ করল। রতনের কথামতো অফিস ছুটি হয় ছয়টার দিকে। চারটের মধ্যে তাকে সব গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। সে তা-ই করল। চারটে বেজে এক মিনিটে ঘরে তালা লাগালো।
সজিবের অফিসের সামনের বিল্ডিংয়ের দোতলায় ক্যাফে আছে। কাঁচের ভেতর থেকে রাস্তার সবকিছু পরিষ্কার দেখা যায়। সোমা আগেভাগে গিয়ে রাস্তার দিকের একটা টেবিলে বসে পড়ল।
সজিব অফিস থেকে বের হয়েছে। সে ঘড়িতে সময় দেখল। ছয়টা বাজতে আট মিনিট বাকি। সোমা ক্যাফে ছেড়ে বেরিয়ে এলো। তবে সামনে গেল না। সজিব তখনও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চা খাচ্ছে। সে চা শেষ করে একটা রিকশায় উঠে বসল। সোমা কিছু না ভেবে অন্য একটা রিকশায় উঠে বসল। রিকশাওয়ালার দিকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “ওই রিকশাটাকে ফলো করেন।”
রিকশাওয়ালা হেসে টাকাটা পকেটে ঢোকালো। রসালো সুরে বলল, “লোকটা কী আমাদের মামা নাকি? ওই রকম কিছু করেছে নাকি?”
সোমার গা জ্বলে গেল। বিরক্ত মুখে বলল, “আপনি রিকশা টান দেন। টাকা লাগে আরও পাঁচশ দেব।”
প্রায় দুই ঘন্টা ধরে রিকশা চলছে। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে। রিকশাওয়ালা বিরক্ত হচ্ছে, মুখে প্রকাশ করতে পারছে না। সোমার থেকে সে এক হাজার টাকা নিয়েছে। সোমা বলেছে– লাগলে আরও দেবে। এমন খদ্দের সচারাচর পাওয়া যায় না। আজ পেয়েছে। হাতছাড়া করা উচিত হবে না। সোমা চুপচাপ বসে আছে। কথাবার্তা বলছে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিচ্ছে না। এমন যাত্রী নিয়ে দূরের পথ চলা বেশ কষ্টের।
প্রায় তিন ঘন্টা যাওয়ার পর রিকশা নামল। গ্রামের এলাকা। চারদিকে ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছে। রাতের অন্ধকার যেমন গাঢ় হওয়ার কথা ছিল, তেমন না। আকাশে চাঁদ আছে। চাঁদের আলোয় সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। সোমা যতদূর জানে সজিবের এদিকে কোন আত্মীয় নেই। তাহলে সে এতদূর কার কাছে এলো? সোমার আর দেরি করতে পারল না। তড়িঘড়ি করে রিকশা থেকে নামাল। রিকশাওয়ালা বলল, “ও আপা, চা নাস্তার জন্য কিছু দেন।”
সোমা ব্যাগ থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে রিকশাওয়ালার হাতে দিলো। সজিব চোখের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে ফোনের টর্চ জ্বেলে সজিবের পেছনে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা যাওয়ার পর সোমা বুঝল সে অনেক বড় বোকামি করে ফেলেছে৷ এই রাতে এইভাবে এতদূর চলে আসা একটুও ঠিক হয়নি। সে কোন বিপদ হতে পারত। রিকশাওয়ালা ভুলভাল কিছু করে বসলেও কোন উপায় ছিল না। সোমা নিজের মাথায় থা’প্প’ড় মা’র’ল। ফোন বের করে তার ভাইয়ের নম্বরে কল দিয়ে বলল, “ভাই, তুই কোথায়?”
“এইতো, বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছি।”
“কে কে আছে?”
“আছে সবাই। কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“আমি তোকে একটা লোকেশন পাঠাচ্ছি। তড়িঘড়ি করে সবাইকে নিয়ে সেখানে চলে আয়। আমি একা আছি। কোন প্রশ্ন করিস না। উত্তর দেওয়ার সময় নেই।”
সোমা কল কে'টে দিলো। ভাগ্যিস নেটওয়ার্ক আছে, না হলে যে কী হতো! সজিব হাঁটছে, এত রাতে সোমা তার পেছনে থাকতে পারে এ চিন্তা তার মাথায় আসেনি। আসা সম্ভবও না। সোমা বরাবর খুব ভিতু মেয়ে। রাতের বেলা বারান্দায় যেতে ভয় পায়। আজ সেই মেয়ে কি-না একা একা স্বামীর পেছনে এতদূর চলে এসেছে। কী অদ্ভুত!
খানিকটা যেতেই সোমার নাকে পরিচিত একটা গন্ধ লাগল। কামিনী ফুলের গন্ধ। শার্টে ওইভাবে বোঝা যায় না। রাস্তার দু'পাশে চারাগাছ। সেই গাছে ফুল ফুটে আছে। হাঁটার সময়ে গায়ে গাছের ছোঁয়া লাগছে। সোমা সরু পথ থেকে বেশ অনেকটা এগিয়ে এলো। সামনে ছোট একটা মাঠ, মাঠের একপাশে নতুন ক'ব'র। বাঁশের কঞ্চিতে দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। সজিব ক'ব'রের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। খানিকক্ষণ পর তিনটে ছেলে এসে সজিবের পাশে বসল। সজিব বলল, “তোরা এখানে?”
“হ্যাঁ, আমরা। তোমার অবস্থা দেখতে এলাম।”
সোমা পাশের বটগাছের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ছেলেটার গলার স্বর তার পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথায় যেন শুনেছে। তবে এই মুহূর্তে মনে করতে পারছে না।
ছেলেটা বলল, “মায়ের ক'ব'রের টোপটা ভালোই গিলেছ!”
সজিব বলল, “এ কথার মানে কী?”
ছেলে তিনটে হো হো করে হেসে উঠল। একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বলে দেব নাকি?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ বলে দে। শুনেছি অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে ম'র'লে মানুষের আত্মা ফিরে আসে। তখন আবার কেন আমাদের ঘাড় মটকালো!”
আরেক দফা হাসির শব্দ শোনা গেল। সজিব বলল, “এগুলো কী ধরনের মজা?”
“মজা না সোনা, সাজা। আমরা তোমার সাথে মজা করতে আসিনি। তোমাকে সাজা দিতে এসেছি। উফফ! এসেছি বলছি কেন? সেই বিকেল থেকে এখানে বসে মশার কামড় খাচ্ছি।”
“তোদের কথা কিছু বুঝতে পারছি না।”
“এই তোরা শোন, নেদাবাবু কিছু বুঝতে পারছে না। আচ্ছা বসো। এখানে আয়েশ করে বসো। তারপর বুঝিয়ে বলি।”
সবাই বসে পড়ল। দু'জন সজিবের পেছনে বসেছে। একজন সামনে। বসার ধরন দেখে মনে হচ্ছে সজিব যেন পালিয়ে যেতে না পারে। সোমা শুকনো ঢোক গিলল। ভয়ে তার হাত পা কাঁপছে।
ছেলেটা বলল, “ভাই, আমাদের তো চিনতে পেরেছ নাকি?”
সজিব বলল, “হ্যাঁ, চিনেছি।”
“বেশ ভালো কথা। তা-ও একবার পরিচয় দিচ্ছি। আমরা তোমার একমাত্র চাচার বড় তিন ছেলে। হোসেন, আলী আর তামিম। সম্পর্কে তোমার চাচাতো ভাই।”
“এত পরিচয় দিতে হবে না।”
“আরে পরিচয় দিতে হবে না কেন! বলে রাখি। এবার আসল কথা শোনো, তুমি কী জানো তোমার বাপের জমিজমার পরিমাণ কত?”
“না, জানি না। গ্রামে কিছু আছে কি-না চাচা ভালো জানেন।”
“ঠিক কথা। তুমি কিছু জানো না। তোমার চাচা মানে আমার আব্বা জানে, আর আমরা জানি। দাদার জমির অর্ধেক ভাগ করলে তুমি একা পাবে পনেরো বিঘে, বড় চাচা এর সাথে আরও ছয় বিঘে কিনে রেখে গেছে। এদিকে আমাদের অবস্থা শূন্য। আব্বা নিজের ভাগের জমি বিক্রি করতে করতে আঠারো কাঠায় এসে ঠেক খেয়েছে। হিসেব করলে আমরা এক ভাই দুই কাঠা করে ভাগে পাচ্ছি। এটা কী ইনসাফ হলো?”
“আমায় কী করতে বলো? আমার ভাগ থেকে তোমাদের কিছু জমি দেব?”
“কিছু জমি? হ্যাঁ, তা তুমি কতটুকু করে দেবে?”
“তোমরা আমার আপনজন। এক বিঘা করেই না হয় নিলে।”
“ভালো প্রস্তাব। এখনকার দিনে এক বিঘে বিশাল কথা।”
“তোমরা আমার পর কেউ না। ছোট থেকে চাচা আমাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছে। তাছাড়া গ্রামে যাওয়ার তেমন ইচ্ছে কোন ইচ্ছে আমার নেই। শহরের দিকে চাকরি-বাকরি করি। এদিকেই থাকার ইচ্ছে।”
“তা ভালো। শুনেছি তুমি খুব ভালো ছাত্র। একটা হিসাব করো। তুমি বেঁচে থাকলে আমরা তোমার ভাগ থেকে এক বিঘে করে পাব। আর তুমি ম'রে গেলে? ওহো! তোমার তো আবার ছেলেপুলে নেই।”
সোমার মেরুদণ্ডের ভেতরে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ছেলেগুলো বলল, “শুধু শুধু তোমার মায়ের ক'ব'রের নাটক সাজাইনি। এখানে এই ক'ব'র বানাতে তিন তিনটে দিন সময় লেগেছে। তারপর তোমার এখানে আনা। নিয়ম করে চল্লিশ দিন এক ঘন্টা ক'ব'রের পাশে বসে দোয়া করতে বলা, কাউকে কিছু না জানানো সবটাই তো সাজানো।”
“সবকিছু সাজানো মানে? আমাকে তো এক হুজুর বলেছিল।”
“কী বলছিল হুজুর? কী বলেছিল?”
সজিব কথার জবাব দিলো না। চুপ করে রইল। ওদের একজন বলল, “আব্বা এই ছেলেকে মেধাবী বলে। আরে ওই হুজুর টুজুর সব ভং। আমাদের এই তামিমই হুজুর সেজে তোমার অফিসে গিয়ে ওসব বলে এসেছে। আব্বা তোমাকে মেধাবী বলে! তোমার চেয়ে তো তামিমের মাথার বুদ্ধি বেশি৷ কায়দা করে কাউকে না জানানোর কথাও বলেছিল। এখন তোমাকে মে’রে এই ক'ব'রে পুঁতে দিলেও কেউ কিছু বুঝতে না। তোমার বউ ভাববে– মেয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে। শেষ ক'দিন যে রাত করে বাসায় গেছ তাতে সে এতক্ষণে ধরে নিয়েছে তোমার অন্য মেয়ের সাথে লটরপটর আছে।”
সজিব বলল, “না, সোমা এমন মেয়ে না। ও এসব মনে করবে না। ও আমায় খুঁজবে।”
“খুঁজে কী লাভ সোনা? তোমায় পাবে কোথায়? আর পেলেও পাবে লা'শ। তা-ও পঁচাগলা।”
সোমা আর ভাবতে পারল না। এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। সে মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে। এর মধ্যে যদি তার ভাইটা চলে আসত।
বোধকরি আল্লাহ তার কথা শুনলো। চারটে মোটরসাইকেলে নয়জন লোক এসে বটগাছের পাশে দাঁড়াল। সোমা বলল, “ওরা তোর দুলাভাইকে মে'রে ফেলবে।”
তারপরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। তিন ভাইকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সজিব তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। সে সোমার হাত ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ছেলে মানুষ নাকি কাঁদে না। অথচ সজিব কাঁদছে। সবার সামনেই কাঁদছে। কী অদ্ভুত! বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টি ঝমঝম শব্দ কানে বাজছে। ভালো লাগছে শুনতে।
©ফারহানা কবীর মানাল*