07/08/2026
রফিক সাহেবের স্ত্রী মারা গেলেন দুপুর তিনটার কাছাকাছি সময়ে। সবে হাসপাতাল থেকে এসে দুপুরের খাবার খেতে বসেছিলেন। ফ্রীজের উপর রাখা ফোন বেজে উঠতেই উনি বুঝতে পারলেন, খারাপ কোনো খবর আছে। যেটা শোনার পরে লোক দেখানোর জন্য হলেও না খেয়ে উঠে যেতে হবে। তাই ফোন রিসিভ না করে চিংড়ি মাছ আর পাতলা ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে উঠলেন। এক টুকরো লেবুর অভাব খুব পীড়া দিল তাকে। কিন্তু এই মুহুর্তে বাসায় লেবু তো দূরে থাক লেবুর খোসাও নেই। খাওয়া শেষ করে বারান্দায় বসে একটা সিগারেট ধরালেন। গত তিন দিনের ব্যস্ততায় একটা সিগারেট শান্তিপূর্ণ ভাবে খেতে পারেননি। সিগারেট শেষ করে গোসল করে নিলেন। গোসলটাও করতে পারেননি। তিন দিন আগে শুক্রবার সকালে হঠাৎ করে রান্না ঘরে মাথা ঘুরে পরে গেলেন রেহানা। খিচুড়ি প্রায় হয়ে গেছে, এমন অবস্থায় কেউ বেহুশ হয়? মনে মনে বলতে বলতে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন স্ত্রীকে। সেই খিচুড়ি আর তার খাওয়া হয়নি। হাসপাতালে যাওয়ার আগে মেয়েকে খিচুড়ি এক প্লেট উঠিয়ে রাখতে বলতে ভুলে গেছিলেন। সে যাইহোক, হাসপাতালে নেয়ার পরে জানতে পারলেন স্ত্রী নাকি স্ট্রোক করেছেন। অবস্থা ভালো না। এখনই আইসিইউতে নিতে হবে। রেহানার বড় ভাই এসে হাজির হলেন৷ উনিই নিজ খরচে রেহানাকে আইসিইউতে ভর্তি করালেন। এখন পর্যন্ত সব খরচ উনিই বহন করছেন। একটা সিগারেট শেষ করে আরেকটার জন্য মন আকুপাকু করা শুরু করেছে তার। প্যাকেট থেকে আরেকটা বের করবেন ফোনের রিংটোন সেই মুড নষ্ট করে দিল। বারান্দা থেকে বেরিয়ে আস্তে-ধীরে ফ্রীজের কাছে গিয়ে ফোন হাতে নিলেন। রেহানার ভাই এর নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। রিসিভ করলেন। ওপাশ থেকে যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, অবস্থা ভালো না। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারে। আপনি দ্রুত চলে আসুন। শেষ বারের মতো... খুবই বিরক্ত হলেন। ভাত ঘুমের সময় যেতে হবে সেই হাসপাতালে।
আইসিইউর কাছে যেতে না যেতেই মেয়ে রিতু এসে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরলো তাকে। মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েও পারলেন না। এমন পরিস্থিতিতে কী বলতে হয় তার মনে পড়ছে না। স্ত্রীর এই অবস্থা নিয়েও তার কোনো মাথাব্যথা নেই। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের সংসারে তার কোনো সুখের মুহুর্ত নেই স্ত্রীর সাথে। যা আছে সেগুলো মেকিতা বা লোক দেখানো। শেষ বারের মতো স্ত্রীকে দেখার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও গেলেন।সারাদিন বকবক করে মুখে ফেনা তুলে ফেলানো মানুষটা কী শান্ত ভাবেই না চোখ বুজে শুয়ে আছে! স্ত্রীকে এমন শান্তভাবে দেখতে পাবেন কখনো ভাবেননি। পাশে রিতু দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। রেহানার বড় ভাই পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। তাদের বিয়েটা হয়েছিল একপ্রকার জোর করেই। মাস্টার্স শেষ করে নতুন চাকরিতে যোগ দেয়ার আগে বাসায় এসেছিলেন বেড়াতে রফিক সাহেব। পোস্টিং চট্টগ্রামের কক্সবাজারে। বাড়িতে এসে জানতে পারলেন তার বিয়ে ঠিক করা হয়ে গেছে। আজকে রাতে গায়ে হলুদ, আগামীকাল বিয়ে। মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার অবস্থা তার। এমন না যে কারো সাথে তার কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল! তারপরও ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে চাকরি বাকরি করে পুরো দেশে ঘুরে বেড়াবে। তারপর বিয়ে করবে। এখনই যদি পায়ে শিকল বেঁধে সংসারে আটকে দেয়া হয়। তাহলে তার স্বপ্নগুলোর কী হবে? মা'কে বুঝিয়ে খুব একটা লাভ হলো না। বাবার সামনে গিয়ে মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের করার সাহস পেলেন না। তার বড় দুই বোনকেও বাবা মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তখন মাথায় ঘুণাক্ষরেও আসেনি যে,একই ঘটনা তার সাথেও ঘটতে পারে। বাবার কথামতো বিয়ে করে বউ নিয়ে চট্টগ্রামে সংসার পাতলেন। বহুবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছেন কিন্তু যে সুখ প্রতিটা সুখী দম্পতি পায় ; সেটা তিনি পাননি। বিয়ের চার বছরের মাথায় প্রথম সন্তানের জন্ম হলো। পিতা হওয়ার অনুভূতি তাকে স্পর্শ করতে পারলো না। ছোট্ট সাদাতের মুখের দিকে তাকিয়ে আফসোস করতেন মনে মনে। একটা ভালোবাসাহীন সংসারে জন্ম হয়েছে তার। যার জন্মদাতা পিতাও তাকে পছন্দ করেন না। সাদাতের তিন বছরের মাথায় জন্ম হলো রিতুর। রিতুর জন্মের পরে থেকে রেহানা অসুস্থ হয়ে গেলেন। আজকে এইটা তো পরশুদিন আরেকটা। চট্টগ্রামের পরে তার ট্রান্সফার হলো বরিশালে। এখানের বাংলাবাজারেই তার পুরোনো সংসার শুরু হলো। ত্রিশটা বছর কাটিয়ে দিলেন এমন একটা সংসারে যেখানে স্ত্রী, সন্তানদের উনি মন থেকে ভালোবাসতে পারেননি। রিতুর হাত ধরা অবস্থায় রেহানা শেষ নিশ্বাস ছাড়লেন। সাথে সাথে তিনিও স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। এবার হয়তো তার অভিনয় জগতের সমাপ্তি হবে।
লাশ দাফন করে বাসায় ফিরে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। এবার আর পাশ ফিরলে রেহানার চেহারাটা দেখতে হবে না। এবার আর কেউ ভোর হলেই ডাকাডাকি শুরু করবে না। ক্ষুধায় পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠছে। বাড়ি ভরা মানুষ। রেহানার বাপেরবড়ি থেকে এসেছে, তার ভাই বোনেরা এসেছে। স্ত্রীকে দাফন করে এসেই খেতে বসা যায়না। এটুকু ভদ্রতা বজায় রাখা জরুরি। সাদাত আর রিতু শোকে পাথর হয়ে গেছে। মা'য়ের প্রতি তাদের ভালোবাসা যে গভীর এটা বোঝাই যাচ্ছে। হঠাৎ করে তার মাথায় উঁকি দিল একটা প্রশ্ন, তার মৃত্যুতেও কি ওরা এভাবে শোক পালন করবে? সে তো তাদেরকে কখনো ভালোবাসেনি, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে গায়ে কালো রঙের পাঞ্জাবিটা জড়িয়ে বেরিয়ে পড়লেন। একটা রিক্সায় চেপে বসলেন। রিক্সাওয়ালাকে বললেন ভালো কোনো ভাতের হোটেলে নিয়ে যেতে। উনার বিশ্বাস একমাত্র সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষেরাই জানেন কোথায় ভালো ভাতের হোটেল আছে। মা বাবার দোয়া ভাতের হোটেলের সামনে এসে রিক্সা থামলো। ভাড়া চুকিয়ে হোটেলে ঢুকলেন।
প্রায় সব টেবিলই ফাঁকা। অবশ্য রাত এগারোটার পরে ফাঁকা থাকারই কথা। হোটেলের লোকগুলোও সব খাবার দাবার গুছিয়ে রাখছেন। উনাকে দেখে মনে হলো তারা বিরক্ত হলেন। কাজ শেষ করে বাড়ি যাবে এইসময় কাস্টমার আসলে উনিও রাগ হতেন। একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। তেরো চৌদ্দ বছরের একটা ছেলে এগিয়ে এসে বললেন, " কী খাইবেন?"
" ভাত আছে?"
" হ আছে "
" আর কী কী আছে?"
" সব আইটেমই শ্যাষ। খালি গরুর গোস্ত আর মাছ চচ্চড়ি আছে। "
" গরুর গোস্ত দাও আর দুই প্লেট ভাত। সাথে একটা পেয়াজ, দুটো কাঁচা মরিচ আর এক টুকরো লেবু। "
ছেলে পাঁচ দশ মিনিটের মাথায় সব এনে সামনে সাজিয়ে রেখে গেলো আর বলে গেলো, " একটু তাড়াতাড়ি খাইয়েন। বাড়ি যাওন লাগবো। "
গরুর গোস্তের ঝোল দিয়ে ভাত মাখিয়ে এক লোকমা মুখে দিয়ে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো আইসিইউতে থাকার সময়ের একটা ছোট্ট ঘটনা। স্ত্রীর হাত কিছু মুহুর্তের জন্য স্পর্শ করেছিলেন। বরফ শীতল হাত ধরে উনার শরীর একটা ধাক্কা দিয়েছিল। তখনই স্ত্রী'র বুজে থাকা ডান চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়তে দেখেছিলেন। এতো বছরের সংসারে এক মুহুর্তের জন্য রেহানাকে ভালোবাসতে পারেননি তিনি। স্ত্রী হিসেবে মানতে পারেননি। মা বাবার উপর জেদ করেই সংসার চালিয়ে গেছেন। আজকে যখন সেই বিশ্রী সংসার থেকে মুক্তি পেলেন তখন তার খারাপ কেনো লাগছে? তার তো আনন্দিত হয়ে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয়ার কথা বা শারলিনের সাথে নতুন করে সংসার পাতার স্বপ্ন দেখার কথা! শারলিনের সাথে তার সম্পর্ক এই আট দশ বছর হবে। তারও সংসার সুখের ছিলো না। পরে একটা বাচ্চাসহ ডিভোর্স হয়ে গেছে। সম্পর্কের শুরু থেকে অপেক্ষায় ছিলেন কবে রেহানা নিজ থেকে সংসার ছাড়বেন। রেহানা শারলিনের ব্যাপারটা জানতো। প্রায়ই মুখ গোমড়া করে বসে থাকতো। স্বামীর সাথে রাগ করে না খেয়েও থেকেছেন কিন্তু লাভ হয়নি। উপর দিয়ে নিপাট ভদ্রলোক আড়ালে যে চুটিয়ে প্রেম করছেন - সেটা স্বীকার করতে চাইতেন না। শারলিনের সাথে তার পরশুদিন দেখা করার কথা। হয়তো সেদিনই বিয়েটা সেরে ফেলবেন। শুরু হবে তার যুবক বয়সের কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার সংসার৷ দেশের কোথায় কোথায় ঘুরতে যাবেন সেটারও পরিকল্পনা শেষ তাদের। ভেবেছিলেন রেহানাকে তালাকই দিয়ে দিবেন। কিন্তু তার আগেই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাটা ঘটে গেলো। তারপরও তার ভালো লাগছে না কেন? কেনো ভাতের লোকমা তার গলায় এসে আটকে গেছে? কেনোই বা বারবার রেহানার সেই এক ফোটা চোখের পানির গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছে?
গল্প - এক টুকরো লেবু
লেখক - মারিয়া কবির