30/07/2026
আমার মা আমার স্ত্রীর গালে সবার সামনে চড় মেরেছিল। তখনও সে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছে।
কারণ? এক বাটি গরুর পায়ার ঝোল।
আমি ভেবেছিলাম, আমার স্ত্রী হয়তো রাগ করবে, দু-একদিন কথা বলবে না, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেদিন সে যা করেছিল, তা শুধু আমাকে নয়, আমার মাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর আমাকে এমন এক অনুতাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, যেটা হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্তও ভুলতে পারব না।
আমি রাশেদ। ঢাকার একটি বড় গাড়ির শোরুমে সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি।
আমার স্ত্রী মেহরিন। ঢাকার একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করত। খুব বেশি বেতন না, তবে নিজের সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে সংসারটাকে আগলে রাখত।
আমার মা রহিমা বেগম। সারা জীবন মানুষের বাসায় কাজ করেছেন, সেলাই করেছেন, কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। বাবা মারা গিয়েছিলেন আমি খুব ছোট থাকতেই। সেই থেকে মা-ই আমার বাবা, মা, সবকিছু।
তাই মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর ঋণের শেষ ছিল না। জীবনে কখনো তাঁর কথার অবাধ্য হইনি। তিনি যা বলতেন, সেটাকেই ঠিক মনে করতাম।
মেহরিন যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখনই মা গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে এলেন।
এসেই বললেন,
— "ছেলের বউয়ের এই সময়ে আমি না থাকলে কে থাকবে? নিজের মেয়ের মতোই দেখাশোনা করব।"
মেহরিনের মুখটা সেদিন কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম, ও চাইছিল সন্তান জন্মের পর কয়েকদিন নিজের মায়ের কাছে থাকতে। কিন্তু আমি তখন ভেবেছিলাম, নিজের মা আর শাশুড়ির মধ্যে পার্থক্য কী? মা তো অভিজ্ঞ মানুষ। কত কিছু জানেন।
আজ বুঝি, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সেটাই।
..
আল্লাহর রহমতে আমাদের কন্যাসন্তান জন্ম নিল।
বাড়িতে যেন নতুন আলো নেমে এলো।
মা খুব খুশি হয়ে পরদিন সকালেই বাজারে গেলেন। ফিরে এলেন গরুর পায়া, বিভিন্ন মসলা আর অনেক কিছু নিয়ে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্না করলেন।
বারবার বলতে লাগলেন,
— "এই ঝোল খেলে শরীরে শক্তি আসবে। দুধও ভালো হবে।"
এদিকে মেহরিন তখনও খুব দুর্বল। সন্তান জন্মের কষ্টে মুখ শুকিয়ে গেছে। ঠিকমতো বসতেও কষ্ট হচ্ছিল।
মা এক বাটি ধোঁয়া ওঠা ঝোল এনে বিছানার পাশে রেখে বললেন,
— "নাও, গরম গরম খেয়ে ফেলো। শেষ হলে আবার দেব।"
মেহরিন ধীরে বাটিটার দিকে তাকাল।
উপরে মোটা তেলের স্তর ভাসছে।
ও আস্তে বলল,
— "মা... ডাক্তার বলেছেন প্রথম কয়েকদিন ভারী, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার না খেতে।"
মুহূর্তেই মায়ের মুখের রং বদলে গেল।
— "ডাক্তার! ডাক্তার কী জানে? আমি যখন তোর স্বামীকে জন্ম দিয়েছিলাম, তখন তিনবেলা এসব খেয়েছি। কিছু হয়েছে?"
মেহরিন খুব শান্ত গলায় বলল,
— "সময় তো বদলেছে মা। এখন ডাক্তাররা—"
মা আর শুনলেন না।
কঠিন গলায় বললেন,
— "আমি যা বলছি, সেটাই করো।"
মেহরিন একটু থেমে নিচু স্বরে বলল,
— "ক্ষমা করবেন মা... আমি সত্যিই পারব না। ছোটবেলা থেকেই গরুর পায়া খেতে পারি না। গন্ধেই—"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই...
ঠাস!
একটা জোরে চড় এসে পড়ল ওর গালে।
ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এল মৃত্যুর মতো নীরবতা।
মেহরিন নিজের গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল।
চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
মনে হচ্ছিল, ও নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না, ঠিক কী ঘটল।
আমি ছুটে এলাম বারান্দা থেকে।
— "মা! আপনি এটা কী করলেন?"
মা তখনও রাগে কাঁপছেন।
বললেন,
— "আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্না করলাম, আর সে বলে গন্ধ লাগে? মানে আমার রান্না নাকি নোংরা? এত অহংকার কিসের?"
আমি দেখলাম...
মেহরিনের গালটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু ও কাঁদল না।
চিৎকারও করল না।
শুধু নিঃশব্দে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।
সেই পানি গিয়ে পড়ছিল আমাদের ছোট্ট মেয়ের গায়ে, যাকে সে বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।
আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
একদিকে আমার মা...
অন্যদিকে আমার স্ত্রী...
দুজনই আমার সবচেয়ে আপন মানুষ।
কী বলব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
অনেক কথা মাথায় এল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি এমন একটা কথা বললাম, যেটার জন্য আজও নিজের মুখের দিকে আয়নায় তাকাতে লজ্জা লাগে।
আমি বললাম,
— "মেহরিন... মা তো বড় মানুষ। উনি রাগের মাথায় করেছেন। তুমি প্লিজ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এটা খেয়ে ফেলো। আজকের মতো বিষয়টা শেষ করে দাও।"
মেহরিন ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিটা...
আজও আমাকে ঘুমাতে দেয় না।
সেখানে কোনো অভিযোগ ছিল না।
কোনো চিৎকার ছিল না।
কোনো অভিমানও ছিল না।
ছিল শুধু...
সম্পূর্ণ নিঃশব্দে ভেঙে যাওয়া একটা মানুষের শীতল দৃষ্টি।
মনে হচ্ছিল, ওর ভেতরে আমার জন্য যে শেষ ভালোবাসাটুকু ছিল, সেটাও সেই মুহূর্তে নিভে গেল।
ও আর একটা কথাও বলল না।
নিঃশব্দে বাটিটা হাতে তুলে নিল।
তারপর এক চুমুক...
আরেক চুমুক...
গলা দিয়ে নামাতে কষ্ট হচ্ছিল।
তবু জোর করে খেয়ে যাচ্ছিল।
আর চোখের পানি থামছিল না।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলাম।
সেদিন নিজের কাছেই নিজেকে সবচেয়ে ছোট মানুষ মনে হচ্ছিল।
মা তখন সন্তুষ্ট হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
বাইরে পাশের বাসার এক খালার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বললেন,
— "এখনকার মেয়েদের একটু শক্ত হাতে না ধরলে সংসার করতে শেখে না।"
মেহরিন কিছুই শুনল না।
অথবা শুনেও শুনল না।
খালি বাটিটা নামিয়ে রেখে মেয়েকে বুকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুম পাড়ানোর গান গাইতে লাগল।
কিন্তু সেই গলায় কোনো সুর ছিল না।
ছিল শুধু জমে থাকা কষ্ট।
আমি অনেকবার ভেবেছিলাম ওর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইব।
বলব, আমি ভুল করেছি।
কিন্তু কোনো শব্দ মুখ দিয়ে বের হলো না।
..
সেই রাতেই মেহরিনের প্রচণ্ড জ্বর এল।
বুক ফুলে শক্ত হয়ে গেল।
ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
তবু মুখ চেপে সব সহ্য করছিল।
মা শুধু একবার তাকিয়ে বললেন,
— "এসব স্বাভাবিক। একটু কষ্ট তো হবেই।"
তারপর থেকে মেহরিন যেন বদলে গেল।
আগের সেই হাসিখুশি মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল, জানি না।
ও শুধু তিনটা কাজ করত।
মেয়েকে দুধ খাওয়াত।
ডায়াপার বদলাত।
ঘুম পাড়িয়ে দিত।
এর বাইরে যেন ওর নিজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
মা যা বলতে