25/04/2026
স্মৃতির জলছবি: সেই তপ্ত দুপুর আর আমরা
তখন দুপুর মানে ছিল এক অদ্ভুত স্বাধীনতার নাম। ঘড়ির কাঁটায় যখন বারোটা কি একটা, চারপাশটা নিঝুম হয়ে আসত। বড়রা তখন ভাত খেয়ে একটু গড়িয়ে নেওয়ার আয়োজনে ব্যস্ত, আর আমাদের তখনই শুরু হতো আসল রাজত্ব। আজ এই যান্ত্রিক শহরের এসি রুমে বসে যখন বাইরের তপ্ত পিচঢালা রাস্তার দিকে তাকাই, মনের কার্নিশে এসে জমা হয় ধুলোবালি মাখা সেই সোনালী দিনগুলো।
মনে পড়ে? সেই সময় দুপুরবেলা ঘুমানোর জন্য মা-চাচিদের সে কি আপ্রাণ চেষ্টা! আমরা চোখ বুজে পড়ে থাকতাম ঠিকই, কিন্তু কান খাড়া থাকত বাইরের দিকে। যেই মা’র নিঃশ্বাস একটু ভারী হয়ে আসত, অমনি বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া। রোদে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ার ভয় তখন আমাদের স্পর্শও করতে পারতো না।
আমাদের দুপুরের সঙ্গী ছিল পাড়ার সেই বিশাল পুকুরটা, যেটার ঘাটে শ্যাওলা জমে থাকতো। পুকুরের টলটলে জলে দলবেঁধে ঝাঁপ দেওয়া, কে কতক্ষণ জলের নিচে দম ধরে রাখতে পারে সেই প্রতিযোগিতা—আজকের কোনো দামী সুইমিং পুল কি সেই আনন্দ দিতে পারবে? চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল করে যখন বাড়ি ফিরতাম, মা’র সেই বকুনিতেও এক অন্যরকম মায়া মেশানো ছিল।
দুপুর মানেই ছিল লুকিয়ে চুরিয়ে আচার খাওয়া। রোদে দেওয়া বয়াম থেকে একটু আচার সরিয়ে নেওয়া কিংবা টক বড়ই দিয়ে লবণ-মরিচ মাখা—সেই স্বাদের কাছে আজকের নামী রেস্তোরাঁও হার মানবে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দের মতো দুপুরবেলায় ঘুঘুর ডাক এক অদ্ভুত নির্জনতা তৈরি করতো। সেই নির্জনতা আমাদের একাকী করতো না, বরং আমাদের কল্পনার জগতকে আরও রঙিন করে তুলত।
দুপুর মানে ছিল ড্রয়িং খাতার এক কোণে নিজের ইচ্ছেমতো হিজিবিজি আঁকা, কিংবা পড়ার বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে রাখা কোনো গল্পের বইয়ে ডুব দেওয়া। মাঝেমধ্যে দূরের কোনো বাড়ি থেকে রেডিওতে ভেসে আসত বিকেলের গানের সুর। আমরা জানতাম, এই অলস দুপুর শেষ হলেই আসবে এক দীর্ঘ বিকেল, আর মাঠভর্তি বন্ধুদের হইহুল্লোড়।
আজকালকার বাচ্চাদের কাছে দুপুর মানে ফোন, ট্যাবলেট কিংবা কার্টুন। আমাদের মতো রোদ মাখার সুযোগ হয়তো তাদের আর হয় না। জীবন এখন অনেক গোছানো, কিন্তু সেই অগোছালো দুপুরের মুগ্ধতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে সেই ফেলে আসা দুপুরে ফিরে যেতে। যেখানে কোনো দায়িত্ব ছিল না, ছিল শুধু এক আকাশ সমান বিস্ময় আর এক বুক ভরা সারল্য।
#রোদেলা_দুপুর #গ্রাম_বাংলা #দুপুর