09/04/2023
রোজার শুরুতে ৪-৫ বছরের ছেলে বাচ্চার একটা গেঞ্জি কিনতে গিয়েছিলাম। একদরের দোকান। মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। প্রাইস ট্যাগ খেয়াল করা হয়নি। দোকানদার বেশ আগ্রহী হয়ে প্যাকিং করতে গেলে জিজ্ঞেস করা হল দাম। বললেন ২৫৫০/- টাকা! দাম শুনে কিছু সময় নিজের মস্তিস্কে মনে হল নানান ম্যাথ আর যুক্তি ঘুর ঘুর করছে আর প্রমান করার ক্লু খুজছে যেটাতে জাস্টিফাই করা সম্ভব এরকম দাম। কারন আমাদের মত বড় মানুষের গেঞ্জি ৪০০-৫০০ টাকায় কিনি। গেঞ্জিটিতে এমন কিছু নেই বা স্বর্নের সুতা ব্যাবহার হয়নি যে ছোট্ট একটা গেঞ্জির মূল্য ২৫৫০/- হতে পারে।
বছর দুয়েক আগে প্রথম আমেরির নাম শুনি। তাদের বদৌলতে প্রথম জানতে পারি বাংলা জিলাপির আরেক নাম জালেবি। ১০০ টাকা কেজির জিলাপি খুব সম্ভবত দেখেছিলাম ১৮০০/- বা ২২০০/-, সঠিক মনে নেই। সেবারো এরকম বিষয় সহজে প্রসের করতে পারেনি মস্তিষ্ক। তবে এবার জিলাপির কেজি যখন ২০,০০০/- শুনলাম তখন কেন জানি ১৮০০ টাকা কেজি শুনে যেরকম অবাক হয়েছি তেমনটা অবাক হইনি। হয়ত বিষয়গুলি সয়ে যাচ্ছে। তবে অবাক হয়েছি গোল্ডের জিপালি শুনে। এই গোল্ড খাওয়া যায় বা খাবার জন্য গোল্ড আছে এরকম কিছু আমার নলেজে ছিলনা৷ এখন জানা হয়ে গেল।
নেবুলাইজার কেনার প্রয়োজন ছিল। এলাকার দোকানগুলি বেশি দাম রাখবে ভয়ে এমন একটা ফার্মেসিতে গেলাম যেটার রেপুটেশন বেশ ভাল। কম দাম রাখে তারা। দাম জিজ্ঞেস করতে বলল ৩২৫০/-। বেশ খুশী হয়েছিলাম৷ কারন এলাকায় এটা ৩৫০০ এর বেশি চাচ্ছিল। অত:পর লজ্জা নিয়েই তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম কম রাখা যাবে কিনা। নাকি ফিক্সড। মুচকি হেসে বললেন একটু তো কম রাখাই যায়। অতপর নেবুলাইজার কমপ্রেসর কিনলাম ৩০০০/-। বোগল বাজাতে বাজাতে বাসায় এসে শুধু খটকা লাগছিল আসলে এর দাম কত?
নেটে সার্চ করে সেইম মডেলের দাম দেখে ভীষন কষ্ট পেয়েছি। দাম কোথাও ১৭০০/-। এক জায়গায় দেখলাম ২১০০/-। সেইম মডেল।
এই যে সব সময় ঠকে যাবার যে উৎকন্ঠা, সাসপেন্স এর পেছনে দারুন একটা ব্যাপার আছে। বাংলাদেশে ব্যাবসায়ীদের পণ্যের প্রাইস ট্যাগ দেয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোন নিয়মনীতি মানতে হয়না। এক্ষেত্রে খুব বেশি নজরদারিও নেই। লাইসেন্স বাতিল বা জেইল এরকম কিছু হয়েছে বলে শুনিনি। গত সপ্তাহে একটি খবর দেখলাম দেশে কাপড়ের প্রাইস ট্যাগে ক্রয়মূল্যের থেকে গড়ে ৮০% বেশি দাম লাগানো থাকে। ৮০%!!!!!!! হাস্যকর নয়?
তবে অধিকাংশ ব্রান্ড শপে হয়ত খরচের থেকে ৫-৬ গুন প্রেসিজ প্রাইসিং করে থাকে। এতে অবাক হবার সুযোগ নেই। ব্যাবসার লাইন বুঝলে অনেক কিছুই সম্ভব। একজনকে বলতে শুনেছি ২ কোটি হাতে থাকলে সে নাকি মাসে ১০ লাখ কামাতো।
ফলের এলসি মূল্যে হিসাব করলে গোল্ডেন আপেলের কেজি পড়ার কথা ৬০ টাকা মাত্র। ২৫০ টাকার নিচে আপেলের কেজি নেই। বাজারে নতুন মিশরী খেজুর এসেছে শুনলাম। মেডজুল বা এরকম কি একটা নাম। দাম ১৫০০ টাকা কেজি। কৌতুহলবশত এর দাম কত জানতে গুগল করে দেখলাম আলিবাবাতে মেডজুল বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩.৯৯ ডলার প্রতি কেজি। মিনিমাম অর্ডার করতে হবে মাত্র ১০ কেজি৷ সাধারনত ১০ কেজিতে ৪ ডলার বিক্রির রেট হলে কন্টেইনার ভরে বাল্ক এমাউন্ট আনতে নিশ্চিত এর অর্ধেকের থেকেও কম খরচ হবার কথা। ডিসকাউন্ট পাবার কথা। যাহোক সেই খেজুর ১৫০০ টাকায় আমরা গর্ব করতে করতে একটু বড়লোকির সস মিশিয়ে গিলতেছি।
এই যে ঠকাঠকির বাণিজ্যের লাগাম টানা কি খুব কষ্টের কাজ? প্রাইসিং এর জন্য কি অথরিটি করা যায়না? আমদানি পণ্য হলে সেটার কমার্সিয়াল ইনভয়েস যুক্ত করে আবেদন করে তখন নিয়ন্ত্রিত প্রাইসিং এর সিলিং বেধে দেয়া যায়না? এতে আমদানিতে আন্ডার করার প্রবণতাও কমবে। প্রাইস ট্যাগের ক্ষেত্রে বিক্রেতার দাম ধরার স্বাধীনতা থাকতে পারেনা। অন্যকে ঠকিয়ে অতিমুনাফা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এরকম অন্যায় ও অতিমুনাফাখোরদের দৌরাত্ম্য না কমলে আমাদের মত মানুষের নির্বোধ বিশ্বাসের মূল্য আর থাকবে না। বিশ্বাস বলে কিছু আর রইবে না। এটা সামাজিক জুলুম। এর সুরাহার পথ খুজলে অবশ্যই অনেক ভাল ভাল পরামর্শ পাওয়া সম্ভব। শুধুমাত্র দৈব চয়নে অভিযান কখনোই এর সমাধান এনে দিতে পারবে না।
লেখা: এপ্রিল ৮, ২০২৩
ছবি: রমজান মাসে ফল কিনতে যাওয়ার পর আমাকে প্যাকেটের ভেতর এক টুকরা হার্ড বোর্ড ফ্রি দিয়েছে😐।