01/10/2026
বই পড়ে লাভ কী?
পৃথিবীর সেরা অভ্যাস ও সুন্দরতম নেশা হলো বই পড়া। তাই বই পড়ুন। এতে মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হয়ে উঠবে, ফিরে পাবেন মানসিক শান্তি।
বিখ্যাত লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, "আমাদের বই পড়তে হবে, কেননা বই পড়া ছাড়া সাহিত্যচর্চার উপায়ান্তর নেই।" এই সত্য কি শুধু সাহিত্যের জন্য? বিজ্ঞান, অর্থনীতি, দর্শন, সব রকম জ্ঞানচর্চার শুরুটাই হয় বই পড়া থেকে।
কিন্তু বই পড়া মানে কি শুধুই জ্ঞান অর্জন? আমাদের শরীর ও মনের জন্য এটি সত্যিই উপকারী, নাকি স্রেফ সময় নষ্ট? বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে কী বলছেন? চলুন, গবেষণার আলোকে দেখে নিই।
১. বই পড়লে মস্তিষ্ক হয় আরও সক্রিয়
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমোরি ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী জানতে চান, পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কে ঠিক কী প্রভাব ফেলে। তাঁরা পাঠকদের পড়ার সময় এমআরআই দিয়ে মস্তিষ্ক স্ক্যান করেন। দেখা যায়, বই পড়ার সময় মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বেড়ে যায়। পাঠক যত গভীরভাবে বইয়ে ঢোকেন, মস্তিষ্কের তত বেশি এলাকা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কের সোমাটোসেন্সরি ও মোটর কর্টেক্সকেও সক্রিয় করে। অথচ এই দুই অঞ্চল মানুষের নড়াচড়া ও ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে! বিজ্ঞানীরা উপসংহারে আসেন, গল্প বা উপন্যাস পড়ার সময় পাঠকের অবচেতন মন নিজেকেই মূল চরিত্র ভাবতে শুরু করে। চরিত্রের উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা পাঠক নিজেও অনুভব করার চেষ্টা করেন। ফলে মস্তিষ্কের এই অংশগুলো সাড়া দেয়।
২. মানসিক চাপ কমানোর প্রাকৃতিক টনিক
মানসিক চাপ বা গভীর ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষের জন্য বই পড়া টনিকের মতো কাজ করে। ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের সাসেক্স ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ছয় মিনিট বইয়ে নিমগ্ন থাকলে পাঠকের হৃৎস্পন্দন ধীর হয়, রক্তচাপ কমে এবং পেশি শিথিল হয়। সময় বাড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট পড়লে মানসিক চাপ কমে ম্যাজিকের মতো।
আর বই যে হার্ডকপিই হতে হবে, তা নয়। ই-বুক বা অডিও বুকেও একই রকম ফল পাওয়া যায়। এখানে আসল বিষয় হলো মনোযোগ। বইয়ে মনোযোগ যত বেশি, মানসিক চাপ তত দ্রুত প্রশমিত হয়।
৩. শিশুর বিকাশ ও মা-বাবার বন্ধন
বই পড়া শিশুদের জন্যও দারুণ উপকারী, এমনকি যে শিশু এখনো পড়তে শেখেনি, তার জন্যও। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা দেখান, নিয়মিত পাঠাভ্যাস মস্তিষ্কের গঠন বদলে দিতে পারে এবং নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করে। এতে মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে, ফলে মস্তিষ্ক আরও সূক্ষ্মভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে শেখে। শিশুদের বই পড়ে শোনালে তাদের শ্রবণশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার বিকাশও দ্রুত হয়।
এতে উপকার শুধু শিশুর নয়, অভিভাবকেরও। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ২০২০ সালের গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মা-বাবা ৬ থেকে ১৮ মাস বয়সী সন্তানকে প্রতিদিন বই পড়ে শোনাতেন, তাঁদের মানসিক চাপ ছিল অনেক কম। তাঁরা সন্তানের চাহিদা সম্পর্কে বেশি সচেতন ছিলেন এবং তাঁদের স্নেহশীলতাও ছিল বেশি। মনোবিদদের মতে, এতে মেজাজ ভালো থাকে এবং ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা বাড়ে। তাই আজ থেকেই সন্তানকে নিয়ে বই পড়ার অভ্যাস শুরু করতে পারেন।
৪. স্মৃতিশক্তি হয় ধারালো
পৃথিবী এখন রকেটের গতিতে চলছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে স্মৃতিশক্তি, বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি ধারালো হওয়া জরুরি। বই পড়ার সময় কাহিনি যে ধারায় এগোয়, পাঠকের মনও সেই ধারায় এগোয়। ফলে মস্তিষ্কের স্মৃতিকোষগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। বই দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি, দুই ধরনের স্মৃতিকোষেই অনুরণন তোলে। গল্প-উপন্যাস, এমনকি নন-ফিকশন বইও এ ক্ষেত্রে কাজে আসে।
৫. বাড়ে মনোযোগ ও একাগ্রতা
কাজ কিংবা সৃজনশীলতার চর্চা, সব জায়গাতেই একাগ্রতা জরুরি। কিন্তু একবার ফোনের টুংটাং শব্দে মনোযোগ ভাঙলে তা ফিরে পেতে গড়ে ২৩ মিনিট সময় লাগে, বলছে গবেষণা। লেখক, শিল্পী বা গবেষকের ক্ষেত্রে বারবার এমন হলে কী ঘটে, ভাবতে পারেন! শুধু তাৎক্ষণিক নয়, বারবার বিঘ্ন ঘটলে ভবিষ্যতের কাজেও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৫ সালে কানাডার একদল গবেষক দেখান, ২০০০ সালে মানুষের মনোযোগের গড় স্থায়িত্ব ছিল ১২ সেকেন্ড, যা ২০১৫ সালে কমে ৮ সেকেন্ডে নেমেছে। ওই গবেষণায় দেখা যায়, ১৮-২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের ৭৭ শতাংশই স্মার্টফোনে আসক্ত। এঁদের কাজে মনোযোগ কম, বইও কম পড়েন। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ ফোনে আসক্ত। এঁদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা বেশি, কাজেও মনোযোগ দেন ভালোভাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর করা গবেষণাতেও একই চিত্র। যাদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস থাকে না, তারা বই পড়ে, বিষয়বস্তু সহজে বোঝে এবং পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দেয়।
মোদ্দা কথা, বাধাহীনভাবে বই পড়লে মনোযোগ ও একাগ্রতার পেশির ব্যায়াম হয়। যত বেশি বইয়ে মগ্ন থাকবেন, মনোযোগ তত বাড়বে।
৬. ডিজিটাল মাধ্যম কি বইয়ের বিকল্প?
আজকাল বইয়ের যেকোনো তথ্য স্মার্টফোনেই মেলে। গুগলে সার্চ দিলেই মুহূর্তে সব জানা যায়। বইয়ের কাহিনি নিয়ে নাটক, সিনেমা, সিরিজও হচ্ছে, আর সময় কাটানোর জন্য আছে সোশ্যাল মিডিয়া। তাহলে কি এসবই বইয়ের বিকল্প? গবেষকরা বলছেন, না। মাল্টিমিডিয়া বা চলচ্চিত্র কখনোই বইয়ের বিকল্প নয়। মার্কিন লেখক ও চিত্রশিল্পী টোমি ডি-পাওলাও পাঠাভ্যাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন, কারণ পড়ুয়া মানুষের পক্ষে যেকোনো বিষয় জানা সম্ভব।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা বলছে, চল্লিশ বছর আগের তুলনায় মার্কিনিরা এখন অনেক কম বই পড়েন। বর্তমানে জনসংখ্যার মাত্র ৩১ শতাংশ বছরে অন্তত একটি বই পড়েন, যা আগের চেয়ে ১০ শতাংশ কম। সারা বিশ্বে এই চিত্র আরও খারাপ, আর আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে আরও ভয়াবহ।
তবে শুধু ডিজিটাল দুনিয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সারা দিন শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমে ক্লান্ত মানুষ যদি বিনোদনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া বা স্ট্রিমিং অ্যাপে ঝুঁকে পড়েন, তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না। অনলাইনে পড়ার সুযোগও কম নেই, কিন্তু সেখান থেকে উপকার মেলে কম। একজন পাঠক প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৫৫ সেকেন্ড অনলাইনে পড়েন, যা মন ও মস্তিষ্কের কোনো কাজে আসে না। তাই অনলাইনের বাইরে অফলাইনেও নতুন করে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৭. বই পড়ার নেশা, সবচেয়ে সুন্দর নেশা
বই পড়া বিনোদনও দেয়, আর তার রেশ থাকে বেশ কিছুক্ষণ। কেউ যখন কোনো কিছু ঘটার জন্য ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করেন, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। গল্প বা উপন্যাস পড়ার সময় "এরপর কী হবে" এই অধীর আগ্রহে পাঠকের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এটি মন ও মস্তিষ্ককে উৎফুল্ল রাখে, ফলে বই পড়া হয়ে ওঠে নেশার মতো।
নেশা সাধারণত ক্ষতিকর, কিন্তু বই পড়ার নেশা তা নয়। বরং এটি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে শেখার ও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ধাঁধা সমাধান, সুডোকু মেলানো বা দাবা খেলা যেমন মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, পাঠাভ্যাসও তেমনই মস্তিষ্কের উপকার করে।
শেষ কথা
বই পড়া শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়। এটি মস্তিষ্কের ব্যায়াম, মনের ওষুধ এবং সবচেয়ে সুন্দর বিনোদন। তাই আজ থেকেই দিনে অন্তত ৩০ মিনিট ফোন সরিয়ে রেখে একটি বই হাতে নিন। সন্তান থাকলে তাকেও সঙ্গে নিন। মস্তিষ্ক ক্ষুরধার হবে, মনে ফিরবে শান্তি।
বই পড়ুন, নিজেকে গড়ুন।
লিখেছেন: আফনান খান সিয়াম
তথ্যসূত্রঃ
১. প্রমথ চৌধুরী, "বই পড়া" (প্রবন্ধ)
২. Berns, G. S., Blaine, K., Prietula, M. J., & Pye, B. E. (2013). Short- and Long-Term Effects of a Novel on Connectivity in the Brain. Brain Connectivity, 3(6), 590–600.
৩. Lewis, D. (2009). Galaxy Stress Research. Mindlab International, University of Sussex.
৪. Canfield, C. F. et al. (2020). Beyond Language: Impacts of Shared Reading on Parenting Stress and Early Parent–Child Relational Health. Developmental Psychology, 56(7), 1305–1315.
৫. Harvard Graduate School of Education (2017). Reading to Rewire.
৬. Gallup Business Journal (2006). Too Many Interruptions at Work? (গ্লোরিয়া মার্কের সাক্ষাৎকার)
৭. Sonke, J. et al. (2025). The decline in reading for pleasure over 20 years of the American Time Use Survey. iScience. DOI: 10.1016/j.isci.2025.113288