03/07/2026
কাহিনীটা পড়ে মনের অজান্তে চোখের কোন ভিজে গেলো! মানুষ এতোটাও ভাল হয়? জন্মদাতা না হয়েও বাবার সব দ্বায়ীত্ব পালন যেন তেন ব্যাপার নয়।
(লন্ডনে বৈধ হওয়ার আশায় বিবাহ করেছি,, ৪৬ বছরের ৩ সন্তান এর জননীকে।
অবৈধ ভাবে আজ থেকে ৪ বছর আগে লন্ডনে প্রবেশ করেছি।
বহু কষ্টে এক বাঙালি ভাইয়ের পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নি।
২৮ বছরের আমি এক সুদর্শন যুবক । তবু ও বৈধ কাগজ পএের আশায় এ সিদ্ধান্ত।
বিয়ে টা হলো।
উনার বাসায় চলে গেলাম বিয়ের পর। কারণ উনার নিজের বাসা রয়েছে। আমি আবার অন্য কোথাও রুম নিয়ে থাকলে রুম ভাড়া, বিল, সব মিলিয়ে অনেক খরচ।
উনার বাসায় গিয়ে রীতিমতো আমি যেন গৃহিনী হয়ে পড়ি।
মানে শুরু থেকেই বাচ্চাদের দায়িত্ব, ঘরের দায়িত্ব, আমাকে দিয়ে দেয়।
উলটো হেসে হেসে বলতো এই বাসা তোমার, সাথে বাসার সব কিছু তোমার। এটা বলে আমাকে উনি বেলুনের মতো ফুলিয়ে দিতো।
কিন্তুু উনার তিনটা বাচ্চাই খুব কিউট এবং খুব মিশুক। শুরুতেই তারা আমাকে খুব আপন করে নিয়েছে।
১ম দিকে সব এনজয়ের সাথে করলে ও কিছু দিন যেতেই খুব বিরক্ত চলে আসলো। কারণ বাচ্চাদের টেক -কেয়ার, হতে শুরু করে স্কুলে নেওয়া,তারা কি খাবে, তাদের সাথে গল্প করা, ঘুরতে নিয়ে যাওয়া সব যেন আমার দায়িত্ব ।
আমি গরীব ঘরের সন্তান ছিলাম।
আমি তাকে বললাম দেখো আমার কাজে যেতে হবে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে।
সে বললও....
"ওহে সুদর্শন পুরুষ তোমার বাড়িতে মাসে মাসে যা টাকা পাঠাতে হয় আমি তোমাকে দিয়ে দিব """
তোমার এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
তিনি প্রতি মাসেই বাংলার ৭০ বা ৮০ হাজার টাকা আমাকে দিতেন।।
তার খুব বেপরোয়া জীবন যাপন ছিলেন। তিনি বাসায় যতখন থাকতো হয়তো ঘুমাতো নয়তো ফোন টিপতো।
শুরুর দিকে অনেক রাত করে বাসায় ফিরলে ও।
মাস খানেক পর থেকে ফিরতো ২ বা ৩ দিন পর পর।
উনি সবসময় বন্ধু - বান্ধব, পার্টি এসব নিয়ে মেতে থাকতেন।
উনার বাসায় ও প্রচুর বন্ধু আসতো। উনারা রুমে বসে আড্ডা দিতো।
আমি তার এই বে-পরোয়া জীবন যাপন দেখে বিরক্ত।
কিন্তুু বাচ্চারা আমাকে খুবই আঁকড়ে ধরলো।
আমিই যেন বাচ্চাদের সব। তারা বাসায় যতখন থাকতো আমার সাথে মিশে মিশে থাকতো।
এমনকি রাতে ৩ বাচ্চার সাথেই আমি ঘুমাতাম। তারা আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো।
আমি তো উনাকে বিবাহ করেছি। শারীরিক ভাবে উনাকে কাছে পেতে চাইলাম। উনি সোজা উওর দিলো এটা পসিবল না। বাসায় থাকো কি লাগে না লাগে বলো,
কিন্তুু বেশি কিছু আশা করবা না, তা না হলে বৈধ হওয়ার জন্য কাগজপএ রেডি করে দিব না।
কি আর করার বৈধ হওয়ার কাগজপত্রের লোভে চুপচাপ সহ্য করলাম৷
বাচ্চা ছোট্ট টা খুব অসুস্থ। বয়স ৯ বছর তিনি বাসায় নাই। তিনি অন্য শহরে গিয়েছে।
তাকে ফোনে জানালাম। সে বললও হসপিটালে নিয়ে যাও ওষুধ নিয়ে আসো। সেরে যাবে এত চিন্তিত হওয়ার কি আছে?
ফিরতে দেরি হবে আমার, এত বেশি কল দিয়ে বিরক্ত করি ও না। আর বেশি সমস্যা হলে হসপিটাল ভর্তি করিয়ে রাখো।
আমার অবাক লাগলো একটা মা কিভাবে এমন বলতে পারে।
আমি বাচ্চা টাকে খুব টেক- কেয়ার করে সুস্থ করে তুললাম।
বাচ্চারা আমাকে এত ভালোবাসতো যে তাদের সমস্ত আবদার যেন আমার কাছেই।
আমিই যেন তাদের পৃথিবী। আমরা একসাথে শপিং এ যেতাম। হলিডের সময় এদিক সেদিক ঘুরতে যেতাম। বাহিরে খাবার খেতাম।
আমি অদ্ভুত মায়াতে আবদ্ধ তাদের সাথে ।।
প্রায় ৭ মাস পার হলো। তবু ও আমাকে বৈধ কাগজ পএের জন্য তার কোনো তৎপরতা দেখলাম না।
এটা নিয়ে একদিন তার সাথে খুব ঝামেলা করলাম এবং রাগ করে তার বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম ।
বের হওয়ার দুইদিন পর আমি বাচ্চাদের খুব মিস করছিলাম।
এবং তাদের জন্য খুব কান্না আসছিলো। তারা বিগত ২ দিন শুধু আমাকে কল দিতো।
বাধ্য হয়ে বাচ্চাদের জন্য আবার ফিরে গেলাম।
"আমি তাদের ফোন রিসিভ করে বলেছি আমি আসছি""।
তারা আমার জন্য বাসার সামনের রাস্তায় বসে রইলো। আমি যখন গাড়ি থেকে নামছি তারা দৌড়ে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
আসার সময় তাদের জন্য চকলেট আর কিছু খাবার কিনে এনেছি।
বাসায় এসে সবাই একসাথে খাবার খেলাম। বাচ্চারা শুধু বলেছিলো তুমি আর আমাদের ছেড়ে যেও না।
তাদের দিকে তাকিয়ে বললাম,, ""যাব না তোমাদের ছেড়ে""।
দিন যাচ্ছে,,,, বাচ্চাদের নিয়ে আমার লাইফ। তাদের মা এখন আমাকে মাসে ১ লক্ষ করে টাকা দেয়।
ইভেন এখন সে খুব একটা বাসায় ও থাকে না। ১০ দিন বা ১৫ দিন পর পর আসে।
সে কোথায় হারিয়ে যায় আমরা জানি ও না।
একদিন তাকে বলেছি কোথায় যাও না যাও একটু বলে যেও।
সে চুপ ছিলো উওর দেয়নি। বাচ্চারা ও তার জন্য এখন আর অপেক্ষা করে না। তাদের সমস্ত চাওয়া পাওয়া যেন আমাকে ঘিরে।
একদিন এক ভদ্রলোক বাসায় এসেছিলো।
আমি ভেবেছি হয়তো তার বন্ধু।
কারণ প্রায়ই ছেলে মানুষ ঘরে আসে।
কিছু সময় পর তাদের রুম থেকে চিৎকার চেঁচামেচি।
তখন তিনি বললেন তোর বাচ্চা নিয়ে যা। কোথায় নিয়ে যাবি।
তিনি মেজো বাচ্চা টাকে আমার রুম থেকে নিয়ে গিয়ে লোকটার দিকে ধাক্কা দিলো।
লোকটা বললও কোনো চাইল্ড হোমে দিয়ে দাও। তোমাকে রাখতে বলেছে কে?
টাকা যা লাগে আমি দিব।।
এক পর্যায়ে লোকটা অনেক ঝগড়া করে কিছু টাকা রেখে চলে যাই।
তখন বুঝতে পারি যে তিন সন্তানের বাপ ৩ জন।
আমি এত দিন মনে করেছি তাদের বাবা ১ জন।।
বাচ্চাদের প্রতি মায়া যেন আরো বেড়ে গেলো।
সময় বহমান কেটে গেলো জীবনের ৭ টি বছর।
একদিন তিনি নিজে থেকেই আমাকে বললে কাগজ পএ রেডি করে দাও আমি সব প্রসেসিং করে দিচ্ছি।
১ বছর পর স্বপ্নের সেই ব্রিটিশ পাসপোর্ট আমি পেলাম।
পাসপোর্ট পাওয়ার পর দেশে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলাম।
সে আমাকে টিকেট করে দিলো। এবং পরিবারের সবার জন্য অনেক শপিং করে দিলো। সে টাকা দিয়ে দিয়েছে। আমি বাচ্চাদের সাথে নিয়ে শপিং করে এসেছি।।
আমি যখন দেশে আসবো বাচ্চারা ও আসতো চাইলো। এটা কোনোভাবে পসিবল না বাচ্চাদের সাথে করে দেশে আসা।
আমি বললাম চলে আসবো।
তারা বললও অপেক্ষা করবো,, "তোমার জন্য তাড়াতাড়ি এসো।""
আমি যেদিন দেশে আসবো তারা খুব কান্না করেছে। আমি ও কান্না করেছি এবং কথা দিয়েছি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো।
দেশে এসেই আমার এক অদ্ভুত আনন্দ লাগলো। আমাদের দেশে আলাদা একটা সুঘ্রাণ রয়েছে। আলাদা একটা মাটির গন্ধ রয়েছে।
মা কে দেখে ই ১ ঘন্টা বুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছি৷।
মায়ের আঁচল, মায়ের হাতের রান্না আলাদা এক স্বাদ।
আমি পুকুরে মাছ ধরতাম, পুকুরে বাচ্চাদের মত পানিতে লাফালাফি করতাম। দেশীয় সমস্ত খাবার খেতাম।
১৫ দিন যেতেই আর ভালো লাগছিলো না। আমি বাচ্চা দের খুব মিস করছিলাম।
তারা ফোন করে বলতো খুব মিস করছে আমাকে।
মা বললও বিয়ে করবি না। মাকে বললাম আরেকবার এসে বিয়ে করবো।
বাচ্চাদের জন্য এত কলিজা জ্বলছিলো যে ২ মাস দেশে থেকে আবার লন্ডনে ব্যাক করেছি।
যাওয়ার সময় আমার দেশীয় অনেক খাবার তাদের জন্য নিয়ে এলাম।
মাছ নিয়ে গেলাম, মায়ের হাতের পিঠা, এবং আচাড়,সবজি অনেক কিছু নিয়ে এসেছি।
এয়ারপোর্টে তারা এসেছিলো আমাকে রিসিভ করতে।।
আমাকে দেখে তাদের আলাদা আনন্দ সাথে আমার ও।
সবাইকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলাম। ওরা আমাকে চুমু দিলো।
বাসায় গিয়ে তাদের সাথে প্রচুর আমার দেশের গল্প করেছি একসাথে বসে। যা যা এনেছি তাদের দিলাম এবং তারা খুব মজা করে খেলো।
তাদের মা আবার একটা বিবাহ করেছে।
এবং উনি এখানে এখন খুব একটা এখন আর আসে না।
মাসে ২ বা ৩ বার আসে। তিনি এখন অন্য শহরে থাকেন।
বাচ্চাদের সব কিছু যেন আমি।
বড় বাচ্চার বয়স এখন ২০, মেজোটার বয়স ১৭ আর ছোট্ট টার ১৬।
তারা ও প্রায় বড় হয়ে গিয়েছে। আমি বাচ্চাদের নিজের হাতে ড্রাইভিং শিখিয়েছি।
রান্না শিখিয়েছি,ঘরের কাজ শিখিয়েছি।।
তাদের নিয়ে আমার পৃথিবী। তাদের আমি রাত করে ফিরতে দেই না ঘরে।
সাথে করে নিয়ে যাই কোথাও গেলে। বাজে বন্ধুদের সাথে মিশতে ও দি না।
তাদের লাইফ টা খুবই ডিসিপ্লিন এর মধ্যে রেখেছি।
তাদের সমস্ত কিছু আমাকে দেখতে হয়। আমি ছাড়া তাদের এ শহরে কেউ নেই।
আমরা একসাথে সবাই দূর দূরান্তে ঘুরতে যাই।
আমি এখন দেশে ও যাই না খুব একটা ।
গেলে ও ১০ বা ১৫ দিন থেকে চলে আসি। ।
কারণ বাচ্চারা এতিমের মতো অপেক্ষা করে আমার জন্য।...
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাদের সাথে বাকি লাইফ কাটাবো। যা হওয়ার হবে
শুধু এতটুকু জানি জন্ম দিলে বাপ মা হওয়া যাই না।
কিছু কিছু সম্পর্ক রক্তের চাইতো ও আত্মার টান বেশি হয়ে পড়ে।
দোয়া করবেন আমার আর আমার ৩ বাচ্চা দের জন্য।।
আমি বাকি জীবন তাদের সাথে কাটাতে চাই।)
©️এক লন্ডন প্রবাসী ভাইয়ের ওয়াল থেকে কপি করেছি।