02/10/2024
আপনার ব্যক্তিগত কষ্টগুলো একান্তই আপনার!
মাদরাসাতুল মাদীনায় পড়ি তখন। চতুর্থ কি পঞ্চম বর্ষে। হুট করে একদিন আদীব হুজুর এলেন এশার নামাজে। ইমামতিও করলেন। নামাজের পর আলোচনা শুরু করলেন অদ্ভুত একটা বিষয় নিয়ে।
"দেখো বাজান, তোমার আনন্দ ও কষ্ট উভয়টা খুবই মূল্যবান। যাকে-তাকে বলে এর মূল্য নষ্ট কোরো না। তোমার দৃষ্টিতে যে-আনন্দটা অতি অসাধারণ, অন্যের দৃষ্টিতে সেটা সামান্যও হতে পারে। তোমার অনুভূতিতে যে-কষ্টটা গভীর, অন্যের কাছে সেটা তুচ্ছ। এজন্য, যাকে-তাকে বললে তোমার আনন্দ ম্লান হতে পারে; তোমার কষ্টের অনুভূতি আরও বাড়তে পারে। তুমি যাকে আগ্রহ নিয়ে এসব শোনাচ্ছ, তোমার এসবে তার আগ্রহ নাও থাকতে পারে।"
এরপর গ্রামীণ একটা ছোট্ট ঘটনা শোনালেন। এক ছেলে এসএসসি পাস করে আনন্দচিত্তে গ্রামে ফিরছে। পথিমধ্যে গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক চাচার সাথে দেখা। খুব আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে সে পাসের খবর শোনাল। বৃদ্ধ খুব বিরক্তি নিয়ে জবাব দিলেন—"তয় আমি কি নাচুম?"
নিজের জীবন থেকে শোনালেন আরেক কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা।
হুজুরের এক প্রিয় ছাত্র দেখা করতে এসেছেন অনেকদিন পর। ততদিনে সেই ছাত্র উস্তাদ হয়ে গেছেন। কথাপ্রসঙ্গে হুজুরের বাবার কুশল জানতে চাইলেন। হুজুর প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেন ব্যাপারটা। পরে যখন জানালেন, বাবা ইন্তেকাল করেছেন, দন্তপাটি বের করে সেই ছাত্র নিশ্চিত হতে চাইলেন—"কী বলেন হুজুর, আপনার আব্বা সত্যিই মারা গেছে?"
ঘটনাটা মোটামুটি এমনই। বাবার মৃত্যুর মতো কষ্টকর সংবাদটাও আগন্তুকের হাসি বন্ধের কারণ হতে পারেনি। স্বভাবতই, আদীব হুজুর অত্যন্ত কষ্ট পান এতে।
শেষে বললেন, "যদি কাউকে বলতেই হয়, তাহলে এমন কাউকেই বলো, যে তোমার আনন্দে আনন্দিত হবে; তোমার দুঃখে দুঃখিত হবে। যাকে-তাকে সবকিছু বলে নিজের অনুভূতিকে অপমান করো না। বিশেষত, কষ্ট ও দুঃখের কথা তো নয়ই। কারণ, তোমার ব্যক্তিগত কষ্টগুলো একান্তই তোমার!"
ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টগুলো সবসময় একান্ত নিজেরই থাকে। কেউ কারও দুঃখের ভাগ নেয় না; কেউ কারও কষ্ট বোঝে না। ভাগ নেয় কেবল সেই কষ্টেরই, যেখানে তারও অংশগ্রহণ আছে।
ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বুকে কষ্টের পাহাড় ধারণ করে বেঁচে ছিলেন। কেউ তাঁর কষ্ট বুঝেনি। এগারো সন্তান বুঝেনি। ইউসুফ আলাইহিস সালামকে হারানোর ব্যথা তাদের অনুভূতিতে আঘাত হানেনি। কিন্তু যখন দুর্ভিক্ষের কষ্ট সামনে এসেছে, তখন এগারো সন্তানও কষ্টের ভাগ নিয়েছে। কারণ, এতে তাদের স্বার্থ ও অংশগ্রহণ ছিল।
এই পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তিত্ববান পুরুষের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
এর উত্তরও আছে ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জীবনে। নিজের সকল একান্ত দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। সকল হাহাকার ও ব্যথা একাকার করে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানাবে—ইন্নামা আশকূ বাসসি ওয়া হুযনি ইলাল্লাহ; "আমার সকল দুঃখ-কষ্টের অনুযোগ জানাচ্ছি কেবল আল্লাহর দরবারে"![সূরা ইউসুফ, আয়াত-৮৬]
বান্দার কাছে দুঃখ-কষ্টের অনুযোগ জানাতে নানা প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে; কিন্তু আল্লাহকে বলতে কোনো প্রস্তুতি লাগে না। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে বলা যায়। বান্দা কষ্টের কথা বলতে অপ্রস্তুত হলেও আল্লাহ তায়ালা শুনতে প্রস্তুত।
(কপি)