29/10/2018
শামসুর রাহমান দৃষ্টি ও সৃষ্টি
সৈয়দ জাহিদ হাসান
#শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)
বন্দি শিবির থেকে যিনি প্রথম গান গেয়েছিলেন দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, বিধ্বস্ত নীলিমায় বসে যিনি দেখেছেন উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, তিনি কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। কবি শামসুর রাহমান ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ভূ-ভাগের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও পাঠকনন্দিত শব্দশিল্পী। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন বিদ্রোহী তিরিশের দশকের ঊষালগ্নে, বেড়ে উঠেছেন পঞ্চাশের দশকের বন্ধ্যা মরুভূমিতে, আত্মপ্রকাশ করেছেন ষাটের দশকের রক্তিম অরুণালোকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় শামসুর রাহমান ছিলেন পরাধীন দেশের বিপন্ন কবিসত্তা। তাই তিনি অন্তরে লালন করেছেন স্বাধীনতার রঙিন আকাঙ্ক্ষা। স্বনির্ভর দেশ এবং নিপীড়িত মানুষের স্বপক্ষে শামসুর রাহমানের লড়াই ছিল চিরকালের। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই লড়াই তিনি জারি রেখেছিলেন, যদিও দেশ তখন তথাকথিত শত্রুমুক্ত ছিল।
এ সময়ের বাংলাদেশে শামসুর রাহমান অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখবার মতো বিরাট বড় কবিপ্রতিভা। সংক্ষিপ্ত পরিধিতে শামসুর রাহমানকে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কঠিন একটি ব্যাপার। ‘একজন কবির সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সমগ্র কবিতা পড়া দরকার; খন্ডিত পাঠ তেমন কাজে আসে না।’ এ কথা কবি শামসুর রাহমান যেমন বিশ্বাস করতেন সাহিত্যের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে আমিও তেমনিভাবে বিশ্বাস করি।
কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমান ছিলেন শক্তিধর, ভাগ্যবান কবি। কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেই তিনি চমকে দিয়েছেন সমসাময়িক কবিকুল ও পাঠকবর্গকে। আবির্ভাব মুহূর্তেই তিনি জানান দিয়েছেন তাঁর হাতে নির্মাণ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের শিল্পসফল আধুনিক কবিতা এবং তিনিই নেতৃত্ব দিবেন আগামী বাংলাদেশের কবিতাপ্রদেশ। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। একাই তিনি খা খা মরুভূমিতে পড়ে থাকা বাংলা কবিতাকে টেনে নিয়ে গেছেন উর্বর, শ্যামল-প্রান্তরে। তার সহযোদ্ধা কবিরা অনেকে শুরুতেই সঙ্গ ছাড়া হয়ে গেছেন তার। আঙুলে গোনা যে ক’জন কবি অনেকখানি পথ এগিয়ে গেছেন তাঁর সাথে; একসময় তারাও হয়ে যান অদৃশ্য। কবিতার বিশাল প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি একা। প্রতিদ্বন্দ্বি নেই, প্রতিপক্ষ নেই, সামনে সেই অতিক্রম করার মতো বিপুল প্রতিভা। বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার সাম্রাজ্যে শামসুর রাহমান হয়ে ওঠেন একাকী সম্রাট। নীরব উপকূলে তিনি এক আলোকোজ্জ্বল লাইট হাউজ।
শামসুর রাহমান তখন পোগোজ স্কুলের ক্লাস সিক্সের ছাত্র। এ সময় তার ছোট বোন নেহার-এর মৃত্যু হলে তিনি এক টুকরো গদ্য লেখেন নেহারকে নিয়ে। সেই গদ্য রচনা তার মায়ের চোখের জল এনে দেয়। মায়ের চোখে জল দেখে বালক রাহমান সেই লেখাটি কুচি কুচি করে ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দেন। এরপরে ‘এক টুকরো কয়লার কাহিনী’ লেখেন ক্লাস নাইনের ছাত্রাবস্থায়। এই গদ্য লেখাটিও প্রশংসিত হয় বাংলার শিক্ষক বিনয় বাবু কর্তৃক। শামসুর রাহমানের কবি জীবনের সূত্রপাত মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পণের পর। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় বন্ধু হামিদুর রহমানের পীড়াপীড়িতে। ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় কবিতা প্রকাশিত হলে কবির পিতা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী কবিমাতা আমেনা বেগমকে প্রতিক্রিয়ায় বলেন- ‘এসব আমি ঢের দেখেছি। পারবে সে হুমায়ুন কবিরের মতো কবি হতে?’ পিতার কথা শুনে শামসুর রাহমানও বলেন- ‘যদি আমি কোনোদিন কবি হই, তাহলে আমি হুমায়ুন কবিরের চেয়ে বড় কবি হবো।’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শামসুর রাহমান ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৯)-এর প্রকাশক ও সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের (১৯০৬-১৯৬৯) চেয়ে বড় কবিই শুধু হননি, তিনিই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম কবি। ছেষট্টিটি কবিতাগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, আটটি ছড়ার বই, ছয়টি অনুবাদ ও একটি প্রকৃষ্ট প্রবন্ধগ্রন্থ আছে শামসুর রাহমানের সৃষ্টির ঝুলিতে। শুধু সংখ্যাগত দিক দিয়েই নয়, শিল্পমূল্যের বিচারেও তাঁর সৃজনকর্ম অনন্য ও অদ্বিতীয়।
কবি শামসুর রাহমান কবি জীবনের প্রথম পঁচিশ বছর নিরলস পরিশ্রম করে এগারোটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই এগারোটি কাব্যগ্রন্থ রচনাকালে তাঁকে পরিভ্রমণ করতে হয়েছে প্রকৃতির উষর-উর্বর, নন্দিত-নিন্দিত নানা অলিগলি। এ জন্য তাঁর যাত্রাপথ বহু বাঁকে বেঁকে গেছে, বহুদিকে বিভক্ত হয়ে গেছে তার গন্তব্যবিন্দু, কাব্যরাশি হয়ে উঠেছে বর্ণিল রসের আধার। শামসুর রাহমান তাঁর ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠকবিতা’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় স্বীকার করেছেন এই সহজ স্বীকারোক্তি। তিনি লিখেছেনÑ ‘প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বাগ্দেবীর পেছনে পেছনে ছুটে চলেছি, কখনো তিনি আমাকে নিয়ে যান স্নিগ্ধ উপত্যকায়, প্রাচীন উদ্যানে, ঝরনাতলায়, সূর্যোদয়ে ঝলমলে টিলায়, কখনো বা তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে পৌঁছে যাই চোরাবালিতে। প্রায়শই ব্যর্থতার কুশে পা ক্ষত-বিক্ষত হয়, মাঝে মাঝে অবসাদ আমাকে লক্ষ্য করে, যেমন কোনো শবভুক পাখি চক্রাকারে ওড়ে মৃতকল্প পথচারীর ওপর। কিন্তু আমি কখনো হাল ছাড়ি নি; কোনো একদিন প্রকৃত সিদ্ধির সন্ধান মিলবে, এই আশায় এখনো যাত্রা অব্যাহত রেখেছি।’
শামসুর রাহমান যখন কবিতার মধ্যে প্রকৃতির কথাকার হয়ে পাঠকের সামনে উপস্থিত হন তখন তাঁর মুখে থাকে অন্য ভাষা, গায়ে থাকে অন্য গন্ধ, চোখে থাকে অন্য দৃষ্টি। আবার যখন তিনি মানুষের কথা বলেন, তখন তিনি হারিয়ে যান বাস্তব ও পরাবাস্তবের জাদুর কার্পেটে। মানুষের আবেগ-অনুভূতি অবিকল প্রকাশ করতে পারেন শামসুর রাহমান। অনেক কবি আছেন যাদের কবিতায় আবেগ থাকলে শিল্প থাকে না, আবার শিল্প থাকলে আবেগ হয় অন্তর্হিত। কবি শামসুর রাহমান এই দূষণীয় ত্রুটি থেকে দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে সর্বাংশে মুক্ত। এর কারণ সম্ভবত মানুষ সম্পর্কে তার গভীর অভিজ্ঞতা। মাহুতটুলির বাসায় থাকতে তিনি যেসব বিচিত্র মানুষের সান্নিধ্যে এসেছিলেন তাদের কাছ থেকে কবি অর্জন করেছিলেন নানারঙের অভিজ্ঞতা। এই প্রসঙ্গে শামসুর রাহমান নিজেই বলেছেন, ‘আমি তো জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে চাই, কুড়িয়ে আনতে চাই পাতালের কালি, তার সকল রহস্যময়তা। যে মানুষ টানেলের বাসিন্দা, যে মানুষ দুঃখিত, একাকী, সে যেমন আমার সহচর, তেমনি আমি হাঁটি সে সব মানুষের ভিড়ে, যারা ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে তৈরি করে মিছিল।’ জন্ম থেকেই প্রগতিশীল এই মুক্তমনা কবি। গতির সাথে কুজকাওয়াজ করতে করতে এগিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন তিনি। যা কিছু সুন্দর, সৌম্য, স্বাস্থ্যকর সেসব কিছুর জন্য তার ছিল দুর্নিবার পিপাসা। শামসুর রাহমান স্বাধীনতার কবি, মুক্তির কবি, বাঁধন ছিড়ে বাঁধনহীন হওয়ার কবি। স্বাধীনতা তাঁর কাছে নানা রূপে, নানা আত্মীয়তার পরিচয় নিয়ে সখ্য গড়ে তুলেছে। তিনি মনে করতেন পরাধীনতা পূর্ণিমার চাঁদকে ফাঁসিতে লটকে দেয়, পরাধীনতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পদ্ম কিংবা গোলাপের উন্মীলন আর চপল পরিব্রাজক দোয়েলের শিষ। তাই স্বাধীনতাকে গর্জে ওঠার জন্য বার বার তিনি দোহাই দিয়েছেন- বীর যুবা নূর হোসেনের শাহাদাতের, নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ কারাবাসের, বার্ধক্য আক্রান্ত সুদিনের প্রতীক্ষারত কিশোরীর। কিন্তু তাতেও যখন প্রিয় স্বাধীনতা চোখ তুলে তাকায়নি, তখন তিনি স্বাধীনতাকে সম্বোধন করেছেন ‘প্রিয়তমা’ বলে। কবি আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলেন-
‘তোমাকে ডেকেছিলাম, প্রিয়তমা, যখন সূর্যের সূর্যোদয়ের দিকে
মুখ রেখে যাত্রা ছিলো আমাদের, বুর্জোয়া মোহের
পিছুটান আনেনি তোমার কানে জনগণ-মন জাগানিয়া গান।
জাঁহাবাজ ঈগলের নখরের ভীষণ আক্রোশে
এখনো বন্দিনী তুমি, হাঁটতে পারো না রংধনুর
গালিচা মোড়া পথে।
তুমি বিনে কী দুরূহ এই পথ চলা।’
‘স্বাধীনতা’ বলতে কবি খন্ডিত অর্থে স্বাধীনতা নয়, রাষ্ট্রিক, বৈশ্বিক, ব্যক্তিক ও মানসিক স্বাধীনতার কথাও বলেছেন। কবি শামসুর রাহমানের অন্তর জুড়ে ছিল স্বাধীনতার সার্বক্ষণিক আকাক্সক্ষা। তাঁর ভাষায়-
‘কী করে তোমাকে ভুলি? সৌন্দর্যের মতো আছো ব্যেপে
হৃদয়ে আমার।’
শিশুর সারল্য, যুবকের থরোথরো আবেগ, বৃদ্ধের অনুপম অভিজ্ঞতার অন্য নাম শামসুর রাহমান। তিনি যখন শিশু মনস্তত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন তখন তিনি নিজেই শিশু হয়ে উঠেছেন। যখন তিনি যুবকের কথা বলেছেন তখন তিনি নিজেই হয়ে গেছেন টালমাটাল যুবক। এ কারণেই তিনি যেমন প্রিয় শিশুদের, তেমনি প্রিয় স্বপ্নবাজ যুবকের, তেমনি দোলাচলদীর্ণ বৃদ্ধের।
শামসুর রাহমানের মনন গভীরে একটি বিদ্রোহী মানুষ বসবাস করতো। যার গতি ছিলো দুর্বার কিন্তু কণ্ঠ ছিলো অনুচ্চ। উচ্চ কণ্ঠে তখনি তাঁর দ্রোহী সত্তা জেগে উঠতো যখন ঘটতো সামষ্টিক আকাক্সক্ষার মৃত্যু এবং সেই মৃত্যু পরিণত হতো জাতীয় ঐক্যে। যারা নরপশুদের রুখে দিতে মানবতা-চিহ্নিত প্রগতির পতাকা নিয়ে বের হয় রাজপথে তাদের জন্য শামসুর রাহমানের আবেগ যেন উদ্বেল হয়ে উঠতো। সেই উদ্বেল আবেগের এমন কয়েকটি উচ্চকণ্ঠ কিন্তু বেদনাসিক্ত কবিতার নাম ‘পুরাণের পাখি’ (শহীদ রাজুকে নিয়ে লেখা), ‘আসাদের সার্ট’ (শহীদ আসাদকে নিয়ে লেখা), ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ (শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা), ‘বরকতের ফটোগ্রাফ’ (শহীদ বরকতকে নিয়ে লেখা)। এসব কবিতায় শামসুর রাহমান সুখকর নিরালা আশ্রয় ছেড়ে যেন বেরিয়ে এসেছেন রাজপথের জঙ্গি মিছিলে এবং ওই সব বীর শহীদদের উদ্দেশ্যে তিনি সাহসী কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন
‘ওরা তোমাকে যতই পুড়িয়ে ভস্ম করুক হিংসার আগুনে,
তুমি বারবার আগুন থেকে বরিয়ে আসবে পুরাণের পাখি।’
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের অতুলনীয় রূপকার শামসুর রাহমান। সময়ের স্পন্দনকে তিনি এতটাই অনুভব করতে পারতেন যে দ্বন্দ্বমুখর প্রতিটি মুহূর্ত তার সাথে কথা বলতো নিজের ভাষায়।
শামসুর রাহমান তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় যদিও বলেছেন,
‘সামান্য মানুষ আমি, এর চেয়ে বড় পরিচয়
নেই কোনো এই অধমের।’
কিন্তু শামসুর রাহমানের একটি বড় পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন একজন সৌন্দর্যমুগ্ধ, অকৃত্রিম প্রেমিক। প্রেমের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। এমনকি আত্মঘাতী হতেও দ্বিধা ছিল না তার। ‘চলে যাওয়া যার রীতি’ কবিতায় আছে,
‘পারবে কি কেউ আমার মতন
পোড়াতে নিজের ঘর?
পারবে ছিন্ন করতে নিজেরই
মুন্ডু এবং ধড়।’
তবে মুন্ডু ও ধড় ছিন্ন করার সাহস রাখেন যে কবি তাঁর বেপরোয়া হওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু শামসুর রাহমান আত্মসমাহিত, একনিষ্ঠ। তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন এরকম-
‘বিশ্বাস কর, তোমাকেই ভাবি
ভাবছি অহর্নিশ।
অমৃত চেয়েছি তৃষ্ণা মেটাতে
উগরে দিয়েছ বিষ।’
প্রেমে যে অটল থাকতে পারে তাকে তো শুদ্ধ প্রেমিক বলতেই হয়। শুদ্ধ প্রেমিক যদি কেবল আত্মবিসর্জনই দেয় কিন্তু প্রেমাস্পদকে না পায় তাহলে তা প্রেমের জন্য নিতান্তই গ্লানিকর। তাই বুকের ভেতর বয়লার ধারণ করেও শেষমেশ কবির ভাগ্যে জোটে পাথর ফেটে বেরিয়ে আসা স্বচ্ছ জলধারা। আর সেই রিনিঝিনি জলধারা কবিকে দেয় অসীম আনন্দ। কবি তখন বলে ওঠেন,
‘বুকের ভেতর কারখানার বয়লার
ঘোরাঘুরি ক্রমাগত পর্দা সরিয়ে
হঠাৎ তুমি নুড়ি ঠেলে বেরিয়ে আসা ঝর্না।
আমার আঙ্গুলে।’
ভাবকে ভাষা দিতে গিয়ে তিনি যেভাবে আবেগকে শাসন করেছেন, শব্দপ্রকৌশলে যতœবান হয়েছেন, কাব্যতত্ত্বের সূত্রাবলি নিপুণভাবে প্রয়োগ করেছেন তা তুলনারহিত। শামসুর রাহমানের কবিভাষা, তার নির্মিত চিত্রকল্প, উপমা স্বাতন্ত্র্যম-িত। যদিও অসংখ্য কবির কাছে ঋণ রয়েছে শামসুর রাহমানের, সে কথা তিনি স্বীকারও করেছেন তার অসংখ্য লেখায়Ñ তবু ঋণ নিয়ে তিনি দেউলিয়া হননি, হয়েছেন অপরিমেয় প্রাচুর্যের অধিকারী। এক অর্থে শামসুর রাহমান দ্রোহে দর্পিত, প্রেমে মথিত এবং আবেগে এলোমেলো। আবার অন্য অর্থে তিনি ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো নিশ্চল পাথর। শামসুর রাহমান স্বাধীনতাকামী, শামসুর রাহমান প্রেমিক, শামসুর রাহমান সাম্প্রদায়িক শক্তি ও মৌলবাদবিরোধী। যখনই তিনি যে বিষয়কে অবলম্বন করেছেন সেই বিষয়ই তার হাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তাঁর কাছে যা চাই, তাই পাই। এ জন্য তিনি আমাদের এত আপন, এত প্রিয়।
কোনো কোনো কবি নিজের প্রতিভা নিজেই অপচয় করেন। হয়ে ওঠেন নানা রকম মুদ্রাদোষে দুষ্ট। বেশিদিন আর তাকে ভালো লাগে না পাঠকের। শামসুর রাহমান এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি আত্মপ্রদক্ষিণরত নন। বারবার তিনি নতুন নতুন বিষয় আর ভাব নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন পাঠকের সামনে। এজন্য তিনি চিরপরিচিত হয়েও চিরনতুন। স্বকালকে যিনি শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে ধারণ করতে পারেন তিনিই সত্যিকারের কবি। নাগরিক কবি শামসুর রাহমান তা পেরেছিলেন। এ জন্যই তিনি আমাদের প্রধান কবি, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার শ্রেষ্ঠকবিও তিনি-ই।