25/09/2026
৬টি বছর, ২১৯০টি দিন, আর ৫১ একরের একটি মহাবিশ্ব।
কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, "ক্যাডেট লাইফ কেমন ছিল?"—তখন মুখে হয়তো বলি, "অনেক শৃঙ্খলার, অনেক নিয়মের।" কিন্তু বুকের খাঁচায় যে স্মৃতিগুলো তোলপাড় সৃষ্টি করে, সেগুলোকে কি কোনো বাঁধাধরা সংজ্ঞায় আটকানো যায়? বাইরের মানুষ দেখে শুধু চকচকে বুট, ইস্ত্রি করা খাকি আর প্যারেড গ্রাউন্ডে কদম মেলানো কিছু গম্ভীর মুখ। তারা কোনোদিন জানবে না—এই গাম্ভীর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে কৈশোরের শত-সহস্র গোপন কান্না, রাত জাগা আবেগ, আর জীবনের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ কিছু ভালোবাসার গল্প।
ক্যাডেট কলেজ কোনো সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটা জীবনের এক অদ্ভুত কারখানা। যেখানে ১২ বছরের একটা অবুঝ, মায়ের আঁচল ধরে থাকা শিশুকে এনে ছেড়ে দেওয়া হয়, আর ৬ বছর পর যখন তাকে বের করা হয়, সে তখন আর শুধু একজন ব্যক্তি থাকে না—সে হয়ে ওঠে এক একটি শক্ত পাহাড়, যার বুকে লুকিয়ে থাকে সমুদ্রসম স্মৃতি।
মনে পড়ে সেই প্রথম দিনটার কথা। মা-বাবার হাত ছেড়ে যখন ডরমিটরিতে প্রথম একা দাঁড়িয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল পৃথিবীটা বুঝি এখানেই শেষ। রাতে লাইটস আউটের পর বালিশে মুখ গুঁজে কান্নার শব্দ যেন না বের হয়, সে কী আকুল চেষ্টা! প্রতিদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় কেটে কেটে দিন গোনা—"আর কতদিন পর ভ্যাকেশন?"
কিন্তু সময় কী এক অদ্ভুত জাদুকর! যেই জায়গাটাকে প্রথম দিন বন্দিশালা মনে হয়েছিল, সেই লাল ইটের দেয়াল, ডাইনিং হল, প্রেপ, একাডেমি আর প্যারেড গ্রাউন্ডই যে একদিন হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা হয়ে উঠবে, তা কে জানত? ৫১ একরের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি গাছের ছায়া আজ চেনা কোনো গল্পের মতো পিছু ডাকে।
আমরা একই রক্তের ভাই নই, কিন্তু আমাদের আত্মার সুতো একই সূক্ষ্ম সুতোয় বাঁধা। যে ছেলেটার সাথে হয়তো সামান্য কারণে ঝগড়া করেছি, রাত ১২টায় তারই বার্থডেতে গণ দিয়ে একসাথে কেক ভাগ করে খেয়েছি। এক বালতি মুড়ি মেখে ১০-১৫ জন মিলে খাওয়ার যে ট্র্যাডিশন, তার মধ্যে যে কী এক ঐশ্বরিক তৃপ্তি ছিল, তা কোনো পাঁচতারকা হোটেলের বুফেতেও পাওয়া সম্ভব নয়।
যখন রাতে একা একা মন খারাপ হতো, হোমসিকনেস চেপে বসত, তখন কোনো দামী থেরাপি লাগত না। ডরমিটরির ঠাণ্ডা মেঝেতে বসে বা হাউসের টেরাসে দাঁড়িয়ে বন্ধুর কাঁধে একটা হাত— আর সেই চিরচেনা আশ্বাস: "ধুর ব্যাটা, প্যারা নাই! আমরা আছি তো।"—এক নিমেষে সব বিষাদ উধাও করে দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।
ক্লাসে সবাই মিলে ধরা খাওয়া, একসাথে ইডি (Extra Drill) বা ফ্রন্টরোল দেওয়া—শাস্তির যন্ত্রণার চেয়েও সেখানে বেশি ছিল একসাথে হাসার রাজকীয় আনন্দ। মার খাওয়ার পর শরীর ব্যথা করলেও মনটা হালকা হয়ে যেত, কারণ জানতাম—এই কষ্টে আমি একা নই, আমার ৪৬টি প্রাণ আমার পাশে আছে।
ক্যাডেট লাইফ আর ফুটবল মাঠ—এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক।
বিকেলে মাঠে নেমে পড়ার যে উন্মাদনা, তার সাথে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা হয় না। হাঁটু ছিলে যাওয়া, রক্ত বের হওয়া, কনকনে শীতে ভোরের জমে থাকা শিশিরে শরীর ভিজিয়ে দৌড়ানো—এসব কোনোদিন কষ্ট মনে হয়নি। হাউসের সম্মানের জন্য, শেষ মুহূর্তে বিজয়ের গোলটা এনে দেওয়ার জন্য নিজেদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাওয়ার নামই ছিল গেমস টাইম।
গেমস শেষে শরীরভর্তি কাদা আর ঘাম নিয়ে এক বোতল মাউন্টেন ডিউ বা পানির বোতল ১০ জন মিলে ভাগ করে খাওয়ার মাঝে যে তৃষ্ণা মেটানোর আনন্দ ছিল, তা বলে বোঝানো অসম্ভব। ওই সবুজ ঘাস সাক্ষী, কত শত বিকেলের সোনালী রোদ আমরা একসাথে গায়ে মেখেছি, কত পরাজয়ের কান্না আর কত জয়ের বাঁধভাঙা উল্লাস ওই মাঠে ফেলে এসেছি।
ক্যাডেট কলেজের এই প্রথাটি পৃথিবীর আর কোথাও নেই—সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক। শুরুতে হয়তো রাগ হতো সিনিয়রদের কড়া শাসনে। মনে হতো এত নিয়ম, এত প্রথা কেন? কিন্তু সময় যত গড়ায়, বিদায়ের ক্ষণ যত কাছে আসে, তত উপলব্ধি করা যায়—সেই বকাঝকা আর শাসনের আড়ালে কতটা খাঁটি অভিভাবকত্ব আর ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল। সিনিয়ররা শেখায় কীভাবে জীবনের লড়াইয়ে উঠে দাঁড়াতে হয়, আর জুনিয়ররা শেখায় কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে আগলে রাখতে হয়।
ছোট ভাইদের ঘুমিয়ে পড়া ধরা, ডাইনিং হলে একটু চোখ রাঙিয়ে আবার আড়ালে মুচকি হেসে মাফ করে দেওয়া, পরীক্ষার আগে রাতে ওদের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া—এই ছোট ছোট স্মৃতিগুলোই দিনশেষে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। ওদের চোখ দেখে বোঝা যায়, ওরা শুধু সিনিয়র হিসেবে নয়, বড় ভাই হিসেবে কতটা ভরসা করে।
অবশেষে সেই দিনটি এসেই যায়, যা আমরা কেউ কখনো কল্পনা করতে চাই না—বিদায়।
যে খাকি পোশাকটা গায়ে জড়াতে একসময় বিরক্তি লাগত, আজ সেই খাকিটা চিরতরে খুলে রাখার কথা ভাবলেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। আর কোনোদিন ভোরের বিউগলে ঘুম ভাঙবে না, আর কোনোদিন নাইট ডিউটি মাস্টারকে ফাঁকি দিয়ে গভীর রাতে ফিসফিস করে গোপন গল্প বলা হবে না, প্রেপ টাইমের সেই নিরবতায় আড্ডা জমা হবে না, আর কখনো ডাইনিং হলের সেই চেনা টেবিলে সবাইকে একসাথে পাওয়া যাবে না।
আমরা সবাই যার যার পথে হেঁটে যাব। কেউ হয়তো দেশের সীমান্তে পাহারা দেবে সেনা পোশাকে, কেউ স্টেথোস্কোপ হাতে জীবন বাঁচাবে, কেউ কর্পোরেট জগতের ব্যস্ততায় ডুবে যাবে। কিন্তু জীবনের সমস্ত ব্যস্ততা, সফলতার ভিড়ে আমরা সবাই ফিরে যাব সেই ৫১ একরের স্মৃতিতে। কোনো এক ক্লান্ত শ্রাবণ বিকেলে বা নির্জন রাতে মনটা যখন খুব বিষণ্ণ হবে, তখন চোখ বুজলেই ভেসে উঠবে লাল ইটের দেয়াল, বন্ধুদের হাসি আর সেই চিরচেনা স্লোগান।
ক্যাডেট কলেজ আমাদের শুধু পড়াশোনা বা শৃঙ্খলা শেখায়নি, আমাদের মানুষ বানিয়েছে। শত কষ্টের মাঝেও শূন্য পকেটে একসাথে হাসতে শিখিয়েছে। আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে হেরে গিয়েও বন্ধুর হাত ধরে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়।
✍️লেখক : খালিদ মাহমুদ সাজিদ