26/11/2025
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান করেছেন একদল বিশেষজ্ঞ। (Experts Call For Urgent Action on Ultra-Processed Foods After Landmark Review)
'দ্য ল্যানসেট' (The Lancet) জার্নালে প্রকাশিত অতিসম্প্রীতি এক দল গবেষকের গবেষনায় এক চাঞ্ছল্যকর বিষয় উঠে এসেছে। তাদের গবেষনায় দেখা গেছে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য (Ultra-processed foods) বিশ্বব্যাপী ঐতিহ্যবাহী খাদ্য বা নানা ধরণের খাবারকে প্রতিনিয়ত প্রতিস্থাপিত করে চলেছে, যাতে তারা খাদ্যের গুণমান হ্রাস এবং খাদ্য-সম্পর্কিত দীর্ঘস্থায়ী রোগের উত্থানে অবদান এর কথা উল্লেখ করেছেন। আরো মজার ব্যাপার হলো তাদের মতে কিছু শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সংস্থা গুলির সম্মিলিত বিজ্ঞাপনের ব্যয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মোট বাজেটের চেয়েও অনেক বেশি। আরো কিছু ব্যাপার যেমন সরকার, সম্প্রদায় এবং স্বাস্থ্য পেশাদারদের এই অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।
তাদের মতে আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (Ultra-Processed Foods - UPF) বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বাড়তেই থাকবে। এর ফলে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং পৃথিবীর সমস্ত কিছুর ক্ষতির কারণ হবে বা হয়ে চলেছে। গবেষক লেখকদের মতে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে সামনে পরিস্তিতি ভয়ানক আকার নেবে। আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্যের মান দিনকে দিন কমিয়ে দিচ্ছে এবং খাদ্য-সম্পর্কিত দীর্ঘস্থায়ী রোগ বৃদ্ধি করছে। এই অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার প্রস্তুতকারী শিল্পসংস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং মুনাফা দ্বারা পরিচালিত, যারা ব্যাপক বিজ্ঞাপন এবং লবিংয়ের মাধ্যমে এই সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তাদের তৈরি উপাদান গুলোর মধ্যে আছে শিল্পজাত উপাদান এবং প্রসাধনী সংযোজনকারী (cosmetic additives) থেকে তৈরি পণ্য, উদাহরণস্বরূপ কোমল পানীয়, চিপস এবং অনেক প্রাতরাশ শস্যদানা (breakfast cereals)। আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে বললে, এটি শুধু "খুব বেশি চিনি, লবণ বা চর্বি" বিষয় নয়। তারা তাদের ক্লিনিকাল ট্রায়াল গুলোতে দেখেছেন যে, যখন প্রাপ্তবয়স্করা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ভারী খাবার খান, তখন তারা প্রতিদিন প্রায় ৫০০-৮০০ অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করেন, ওজন এবং চর্বি বৃদ্ধি করে। যাকে ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট সংযুক্ত নন-অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়। তাদের মতে এই বিষয়ে এখনই আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।
এই ধরনের খাদ্য সাধারণত স্থূলতা (Obesity), টাইপ ২ ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes), হৃদরোগ (Cardiovascular Disease), বিষণ্ণতা (Depression), এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এককভাবে মানুষের ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়, বরং বাণিজ্যিক স্বার্থই এই খাদ্যগুলোর উত্থানের প্রধান কারণ। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারি নীতি, যেমন - খাদ্য প্রস্তুতকরণে নির্দিষ্ট সংযোজন (additives) ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ, সতর্কতামূলক লেবেল (warning labels) এবং কর্পোরেট ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কর ব্যবস্থা (taxes) চালু করা প্রয়োজন। আমাদের ভারতের মতো একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান এবং খাদ্যাভ্যাস দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাদের ওই প্রবন্ধের বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যাই হোক তাদের কিছু সতর্কবার্তা এবং সরকার গুলির জন্য নীতি বিকল্পগুলি হিসেবে কি হতে পারে সেই বিষয়ে চারটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন:
১. পণ্য পরিবর্তন: সংস্কার (reformulation) পরিবর্তে, সরকারগুলি নির্বাচিত সংযোজনকারীর উপর সীমা নির্ধারণ করতে পারে এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য গুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য চিহ্নিত করতে "অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য চিহ্নিতকারী" (ultra-processed food markers) যেমন রং, ফ্লেভার এবং নন-সুগার মিষ্টি বর্ধক (পাশাপাশি উচ্চ মাত্রার চিনি, চর্বি এবং লবণ) যাতে ব্যবহার করতে পারে তার নীতি নির্ধারণ।
২. খাদ্য পরিবেশের উন্নতি: বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক সতর্কীকরণ লেবেল গ্রহণ করা, যা ভোক্তাদের সচেতনতা এবং ক্রয় কমাতে ভালো কাজ করে। ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের - বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে - অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিপণন থেকে রক্ষা করা এবং সুরক্ষাগুলিকে "বাচ্চাদের সময়"-এর বাইরেও প্রসারিত করা। চিনিযুক্ত পানীয় (অন্তত ২০% দ্বারা) এবং নির্বাচিত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে কর আরোপ করা; রাজস্ব নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ফল, সবজি এবং সদ্য প্রস্তুত খাবারে ভর্তুকি দিতে ব্যবহার করা। স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য পাবলিক প্রতিষ্ঠান থেকে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য অপসারণ করা, সুপার মার্কেট গুলিতে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ভাগ সীমিত করা এবং স্কুলের কাছাকাছি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ জারুলি।
৩. কর্পোরেট ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ: সরকারগুলি কোম্পানি গুলোর পোর্টফোলিওকে আরও বেশি করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য থেকে বিক্রয়ের অনুপাত পর্যবেক্ষণ ও সীমাবদ্ধ করতে পারে; প্রতিযোগিতা নীতি জোরদার করতে পারে এবং অতিরিক্ত বাজারের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কর সংস্কারের কথা বিবেচনা করতে পারে।
৪. ভর্তুকি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল কে লক্ষ্য করা: সরকারগুলি অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের জন্য এক-ফসলী বাণিজ্যিক উপাদান (যেমন ভুট্টা, সয়াবিন এবং চিনি) থেকে কৃষি ভর্তুকি সরিয়ে নিতে পারে এবং পরিবেশগত নীতি গুলো (যেমন প্লাস্টিক হ্রাস বা জল ব্যবহার সম্পর্কিত বিষয়) পুষ্টির লক্ষ্যগুলোর সাথে সারিবদ্ধ করতে পারে।
আমাদের ভারতের ক্ষেত্রে আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (যেমন প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, মিষ্টি পানীয়, এবং রেডি-টু-ইট খাবার) এর বিক্রি এবং ব্যবহার শহরাঞ্চলে ও গ্রামীণ উভয় ক্ষেত্রেই দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধরনের খাবারের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে ভারতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, (বর্তমানে ভারত ডায়াবেটিসের ওয়ার্ল্ড ক্যাপিটাল) এবং হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগ (Non-Communicable Diseases - NCDs) মহামারীর আকার নিচ্ছে। ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন তথাকথিত "ট্রিপল বার্ডেন অফ ম্যালনিউট্রিশন" (একই সাথে অপুষ্টি, অতিরিক্ত পুষ্টি এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট এর অভাব) এর শিকার, যেখানে UPF-এর উচ্চ ব্যবহার একটি বড় ভূমিকা পালন করে চলেছে।
UPF সস্তা উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়ায় এবং দীর্ঘ শেল্ফ-লাইফ থাকায় প্রস্তুতকারকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এর ব্যাপক বিপণন (marketing) এবং লবিংয়ের ফলে সরকারের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতির বাস্তবায়ন কঠিন হচ্ছে। অন্যদিকে, এই খাদ্য থেকে উদ্ভূত রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়ছে। আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং রান্না করার সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করে চলেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পুষ্টিকর ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো এখন শহুরে ও নতুন প্রজন্মের খাদ্যাভ্যাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা ভারতের সরকারের জন্য এই গবেষণা নিম্নলিখিত কারণে গুরুত্বপূর্ণ। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষতিকারক উপাদান সম্পর্কে ক্রেতাদের সচেতন করতে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক সতর্কতামূলক লেবেল (Front-of-Pack Warning Labels) চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের লক্ষ্য করে UPF-এর বিজ্ঞাপন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। অস্বাস্থ্যকর UPF-এর উপর 'পাপ কর' (Sin Tax) আরোপ করা যেতে পারে এবং সেই অর্থ স্বাস্থ্যকর, ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের উৎপাদন ও সহজলভ্যতার জন্য ভর্তুকি দিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। স্কুলের পাঠ্যক্রম এবং জনস্বাস্থ্য প্রচারের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী, ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাত খাবারের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
গবেষক রেফারেন্স - Phillip Baker, ARC Future Fellow and Sydney Horizon Fellow, School of Public Health, University of Sydney, University of Sydney; Camila Corvalan, Full Professor of the Public Nutrition Unit of the Institute of Nutrition and Food Technology, Universidad de Chile; Carlos Monteiro, Professor at the Department of Nutrition of the School of Public Health, Universidade de São Paulo (USP); Gyorgy Scrinis, Associate Professor of Food Politics and Policy, The University of Melbourne, and Priscila Machado, Research Fellow, Institute for Physical Activity and Nutrition, Deakin University.
By -শেফ মনু। @ fans@
(Please Follow, likes, shears and comments) 🙏