25/04/2026
আমার তিন মেয়ের জন্ম হওয়ার পরেও যখন আরেকটি মেয়ের জন্ম হলো তখন আমার শ্বশুর বাড়ির লোক সবাই হাসপাতাল থেকে মুখ কা*লো করে চলে গেল। আমার স্বামীও আমাকে একা রেখে চলে গেল—যাকে আমি আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে তখন মনে হচ্ছিল, আমি যেন একা একটা শূন্য ঘরে পড়ে আছি… কেউ নেই, কিছু নেই।
আমার বুকের পাশে ছোট্ট মেয়েটা কাঁদছিল। ওর কান্না যেন আমার হৃদয়ের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল। অথচ আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ঠিকমতো সান্ত্বনা দেওয়ার শক্তিটুকুও পাচ্ছিলাম না। শরীর তখনও দুর্বল, মাথা ঘুরছে, চোখ ঝাপসা… কিন্তু তার থেকেও বেশি কষ্ট দিচ্ছিল মানুষের আচরণ। আমি ভাবছিলাম, একটা মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া কি অপ*রাধ? ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছে—এটা কি আমার হাতে ছিল?
ঠিক তখনই আমার অসুস্থ মা ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসলেন। তার চোখে পানি ছিল, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি। তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার উপরে কারো কোনো হাত নেই মা… তিনি সব নির্ধারণ করে রেখেছেন। তোর চার মেয়ের রিজিক কোথায়, তোকে কোথায় সম্মানিত করবেন, আর কোথায় তোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবেন—সব আগে থেকেই লেখা আছে।” মায়ের কথাগুলো শুনে আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব ব্যথা বের হয়ে আসছে। মা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেন তিনি নিজেই আমার সব কষ্ট নিজের ভেতরে নিয়ে নিচ্ছেন।
কয়েক ঘণ্টা পর জানতে পারলাম, হাসপাতালের বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি। শ্বশুরবাড়ির কেউ ফিরে আসেনি। আমার স্বামীও ফোন ধরছে না। তখন মা এক মুহূর্ত দেরি না করে তার গলার সোনার চেইনটা খুলে ফেললেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, “মা, তুমি এটা কী করছো?” মা একটু হেসে বললেন, “এগুলো থাকলে কী হবে, যদি তোর প্রয়োজনেই কাজে না লাগে?”
সেই চেইনটাই বিক্রি করে মা আমার হাসপাতালের বিল পরিশোধ করলেন। তারপর আমাকে আর আমার চার মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এলেন। বাড়িতে ঢোকার সময় আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন পরাজিত হয়ে ফিরে আসছি। সমাজের চোখে আমি হয়তো “অপয়া”, “অযোগ্য”, “চার মেয়ের মা”—এইসব তকমা নিয়ে বেঁচে থাকব। কিন্তু মা একবারও আমাকে সেইভাবে ভাবতে দেননি।
সেই রাতে মা নিজে অসুস্থ শরীর নিয়েও রান্না করলেন। আমার মেয়েদের কোলে নিলেন, আদর করলেন। আমার বড় মেয়েটা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মা, তুমি কাঁদো না… আমরা আছি না?” ওর ছোট্ট কথাগুলো আমার ভেতরে এক অন্যরকম শক্তি জাগিয়ে তুলল। রাত গভীর হলে আমি একা শুয়ে ছিলাম। পাশে আমার নবজাতক মেয়ে ঘুমাচ্ছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি প্রথমবারের মতো একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আর কারো অবহেলার জন্য কাঁদবো না। আমি আমার মেয়েদের এমনভাবে মানুষ করবো, যাতে একদিন এই সমাজই তাদের সম্মান করতে বাধ্য হয়।
পরদিন সকালেই মা বললেন, “মা, জীবন থেমে থাকে না। তুই কী করতে চাস, সেটা এখন ভাব।” আমি চুপ করে রইলাম। আসলে এতদিন আমি শুধু সংসার আর স্বামীকে নিয়েই ভেবেছি। নিজের জন্য, নিজের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করার কথা কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম, যদি আমি নিজে শক্ত না হই, তাহলে আমার মেয়েদের জন্য কেউ দাঁড়াবে না।
সেদিনই আমি মাকে বললাম, “মা, আমি কিছু একটা কাজ করতে চাই।” মা একটু অবাক হলেও হাসলেন, “এই তো আমার মেয়ে। দেরি হলেও ঠিক পথ ধরেছিস।”
কিন্তু পথটা কি সত্যিই সহজ ছিল? মধ্যবিত্ত বাবার বাড়িতে চার মেয়েকে নিয়ে এসে ওঠা মানেই একটা নীরব যু**দ্ধের শুরু। পাড়া-প্রতিবেশী তো বটেই, এমনকি দূর সম্পর্কের আত্মীয়রাও যেন সুযোগ পেয়ে গেল কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার। কেউ কেউ তো সরাসরি বলেই বসল, "বাপের বাড়িতে কয়দিন বসে খাবি? চার চারটে মেয়ের বিয়ে দিতে দিতে তো তোর বাবার ভিটেমাটি সব বিক্রি হয়ে যাবে।"
আমি এসব কথা শুনতাম আর ভেতরে ভেতরে পাথরের মতো শক্ত হতাম। আমার স্বামী, যার নাম শফিক, সে একবারও খোঁজ নিতে আসেনি। অথচ তার প্রতিটি বিপদে আমি নিজের গয়না দিয়ে, শ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই মানুষটা আজ আমার নবজাতক সন্তানের মুখটা পর্যন্ত দেখেনি শুধু সে 'মেয়ে' বলে। ঘৃণা আর অভিমান এক অদ্ভুত জেদে রূপান্তরিত হচ্ছিল আমার ভেতরে।
পরদিন ভোরে উঠে আমি আমার জমানো কিছু পুরোনো সেলাইয়ের কাজ বের করলাম। বিয়ের আগে আমি টুকটাক হাতের কাজ জানতাম। মা আমাকে ছোটবেলায় নকশিকাঁথা আর কুশিকাটার কাজ শিখিয়েছিলেন। সেই শৈল্পিক বিদ্যাই যে একদিন আমার বাঁচার রসদ হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি মাকে বললাম, "মা, আমি সেলাইয়ের কাজ শুরু করবো। ঘরে বসে থাকব না।"
মা আমার চোখে এক নতুন ঝিলিক দেখতে পেলেন। তিনি তার ঘরের পুরোনো ট্রাঙ্ক থেকে একটা সেলাই মেশিন বের করে দিলেন। ধুলো পড়া সেই মেশিনটা যেন আমার নতুন জীবনের চাবিকাঠি। আমি যখন প্রথম সেলাই মেশিনের প্যাডেলে পা রাখলাম, তখন মনে হলো আমি শুধু কাপড় সেলাই করছি না, আমি আমার তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনটাকে আবার নতুন করে জুড়ে দিচ্ছি।
শহর থেকে দূরে এই মফস্বল এলাকায় ভালো ডিজাইনের কাপড়ের খুব চাহিদা ছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সাধারণ দর্জি হবো না, আমি মানুষের পোশাকে ডিজাইন আঁকব। সারাদিন মেয়েদের দেখাশোনা আর রাতের নিস্তব্ধতায় যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন আমি ল্যাম্পের আলোয় কাপড়ে সুঁই-সুতো দিয়ে ফুল তুলতাম। চোখের জল আর সুতোর রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত।
কষ্ট হতো যখন ছোট মেয়েটা খিদের জ্বালায় রাতে কাঁদত, আর আমি দেখতাম আমার বড় তিন মেয়ে একে অপরের হাত ধরে ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তাদের চোখে একটাই প্রশ্ন—বাবা কেন আমাদের নিতে এল না? আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না, কিন্তু মনে মনে
লেখকের পেইজের নাম The Story Haven
বলতাম, "তোমাদের বাবাকে একদিন আফসোস করতে হবে তোমাদের হারিয়ে।"
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই পাড়ার দু-একজন মহিলা আমার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে অর্ডার দিতে শুরু করলেন। কিন্তু আসল লড়াইটা ছিল তখন, যখন শফিকের বড় ভাই অর্থাৎ আমার ভাসুর একদিন হঠাৎ আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলেন। তিনি কোনো সমবেদনা জানাতে আসেননি, এসেছিলেন এক চরম অপ*মানজনক প্রস্তাব নিয়ে।
তিনি বললেন, "শফিক তো তোমাকে আর নিতে চায় না। তবে সে বলেছে, বড় দুই মেয়েকে যদি নানীর কাছে রেখে আসতে পারো, তবে সে তোমাকে আর ছোট দুটাকে নিয়ে সংসার করবে। কারণ চার মেয়ে পালার ক্ষমতা তার নেই।"
আমার তখন হাত কাঁপছিল রাগে..
চলবে...
ঘুরে_দাড়ানোর_গল্প
পর্ব ০১
লেখক The_Story_Haven
প্রথম পর্ব ভালো লেগে থাকলে দয়া করে কমেন্ট করুন। তাহলে খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব পাবেন।