Emon Food Center

Emon Food Center food
(3)

আমার তিন মেয়ের জন্ম হওয়ার পরেও যখন আরেকটি মেয়ের জন্ম হলো তখন আমার শ্বশুর বাড়ির লোক সবাই হাসপাতাল থেকে মুখ কা*লো করে চলে ...
25/04/2026

আমার তিন মেয়ের জন্ম হওয়ার পরেও যখন আরেকটি মেয়ের জন্ম হলো তখন আমার শ্বশুর বাড়ির লোক সবাই হাসপাতাল থেকে মুখ কা*লো করে চলে গেল। আমার স্বামীও আমাকে একা রেখে চলে গেল—যাকে আমি আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতাম। হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে তখন মনে হচ্ছিল, আমি যেন একা একটা শূন্য ঘরে পড়ে আছি… কেউ নেই, কিছু নেই।
​আমার বুকের পাশে ছোট্ট মেয়েটা কাঁদছিল। ওর কান্না যেন আমার হৃদয়ের ভেতরটা ছিঁড়ে দিচ্ছিল। অথচ আমি ওকে জড়িয়ে ধরে ঠিকমতো সান্ত্বনা দেওয়ার শক্তিটুকুও পাচ্ছিলাম না। শরীর তখনও দুর্বল, মাথা ঘুরছে, চোখ ঝাপসা… কিন্তু তার থেকেও বেশি কষ্ট দিচ্ছিল মানুষের আচরণ। আমি ভাবছিলাম, একটা মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া কি অপ*রাধ? ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছে—এটা কি আমার হাতে ছিল?

​ঠিক তখনই আমার অসুস্থ মা ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসলেন। তার চোখে পানি ছিল, কিন্তু মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি। তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার উপরে কারো কোনো হাত নেই মা… তিনি সব নির্ধারণ করে রেখেছেন। তোর চার মেয়ের রিজিক কোথায়, তোকে কোথায় সম্মানিত করবেন, আর কোথায় তোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলবেন—সব আগে থেকেই লেখা আছে।” মায়ের কথাগুলো শুনে আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সব ব্যথা বের হয়ে আসছে। মা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেন তিনি নিজেই আমার সব কষ্ট নিজের ভেতরে নিয়ে নিচ্ছেন।
​কয়েক ঘণ্টা পর জানতে পারলাম, হাসপাতালের বিল এখনো পরিশোধ করা হয়নি। শ্বশুরবাড়ির কেউ ফিরে আসেনি। আমার স্বামীও ফোন ধরছে না। তখন মা এক মুহূর্ত দেরি না করে তার গলার সোনার চেইনটা খুলে ফেললেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, “মা, তুমি এটা কী করছো?” মা একটু হেসে বললেন, “এগুলো থাকলে কী হবে, যদি তোর প্রয়োজনেই কাজে না লাগে?”
​সেই চেইনটাই বিক্রি করে মা আমার হাসপাতালের বিল পরিশোধ করলেন। তারপর আমাকে আর আমার চার মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে এলেন। বাড়িতে ঢোকার সময় আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন পরাজিত হয়ে ফিরে আসছি। সমাজের চোখে আমি হয়তো “অপয়া”, “অযোগ্য”, “চার মেয়ের মা”—এইসব তকমা নিয়ে বেঁচে থাকব। কিন্তু মা একবারও আমাকে সেইভাবে ভাবতে দেননি।
​সেই রাতে মা নিজে অসুস্থ শরীর নিয়েও রান্না করলেন। আমার মেয়েদের কোলে নিলেন, আদর করলেন। আমার বড় মেয়েটা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মা, তুমি কাঁদো না… আমরা আছি না?” ওর ছোট্ট কথাগুলো আমার ভেতরে এক অন্যরকম শক্তি জাগিয়ে তুলল। রাত গভীর হলে আমি একা শুয়ে ছিলাম। পাশে আমার নবজাতক মেয়ে ঘুমাচ্ছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি প্রথমবারের মতো একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আর কারো অবহেলার জন্য কাঁদবো না। আমি আমার মেয়েদের এমনভাবে মানুষ করবো, যাতে একদিন এই সমাজই তাদের সম্মান করতে বাধ্য হয়।

​পরদিন সকালেই মা বললেন, “মা, জীবন থেমে থাকে না। তুই কী করতে চাস, সেটা এখন ভাব।” আমি চুপ করে রইলাম। আসলে এতদিন আমি শুধু সংসার আর স্বামীকে নিয়েই ভেবেছি। নিজের জন্য, নিজের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করার কথা কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমি বুঝতে পারলাম, যদি আমি নিজে শক্ত না হই, তাহলে আমার মেয়েদের জন্য কেউ দাঁড়াবে না।
​সেদিনই আমি মাকে বললাম, “মা, আমি কিছু একটা কাজ করতে চাই।” মা একটু অবাক হলেও হাসলেন, “এই তো আমার মেয়ে। দেরি হলেও ঠিক পথ ধরেছিস।”
​কিন্তু পথটা কি সত্যিই সহজ ছিল? মধ্যবিত্ত বাবার বাড়িতে চার মেয়েকে নিয়ে এসে ওঠা মানেই একটা নীরব যু**দ্ধের শুরু। পাড়া-প্রতিবেশী তো বটেই, এমনকি দূর সম্পর্কের আত্মীয়রাও যেন সুযোগ পেয়ে গেল কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার। কেউ কেউ তো সরাসরি বলেই বসল, "বাপের বাড়িতে কয়দিন বসে খাবি? চার চারটে মেয়ের বিয়ে দিতে দিতে তো তোর বাবার ভিটেমাটি সব বিক্রি হয়ে যাবে।"
​আমি এসব কথা শুনতাম আর ভেতরে ভেতরে পাথরের মতো শক্ত হতাম। আমার স্বামী, যার নাম শফিক, সে একবারও খোঁজ নিতে আসেনি। অথচ তার প্রতিটি বিপদে আমি নিজের গয়না দিয়ে, শ্রম দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই মানুষটা আজ আমার নবজাতক সন্তানের মুখটা পর্যন্ত দেখেনি শুধু সে 'মেয়ে' বলে। ঘৃণা আর অভিমান এক অদ্ভুত জেদে রূপান্তরিত হচ্ছিল আমার ভেতরে।
​পরদিন ভোরে উঠে আমি আমার জমানো কিছু পুরোনো সেলাইয়ের কাজ বের করলাম। বিয়ের আগে আমি টুকটাক হাতের কাজ জানতাম। মা আমাকে ছোটবেলায় নকশিকাঁথা আর কুশিকাটার কাজ শিখিয়েছিলেন। সেই শৈল্পিক বিদ্যাই যে একদিন আমার বাঁচার রসদ হবে, তা কখনো ভাবিনি। আমি মাকে বললাম, "মা, আমি সেলাইয়ের কাজ শুরু করবো। ঘরে বসে থাকব না।"
​মা আমার চোখে এক নতুন ঝিলিক দেখতে পেলেন। তিনি তার ঘরের পুরোনো ট্রাঙ্ক থেকে একটা সেলাই মেশিন বের করে দিলেন। ধুলো পড়া সেই মেশিনটা যেন আমার নতুন জীবনের চাবিকাঠি। আমি যখন প্রথম সেলাই মেশিনের প্যাডেলে পা রাখলাম, তখন মনে হলো আমি শুধু কাপড় সেলাই করছি না, আমি আমার তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনটাকে আবার নতুন করে জুড়ে দিচ্ছি।
​শহর থেকে দূরে এই মফস্বল এলাকায় ভালো ডিজাইনের কাপড়ের খুব চাহিদা ছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সাধারণ দর্জি হবো না, আমি মানুষের পোশাকে ডিজাইন আঁকব। সারাদিন মেয়েদের দেখাশোনা আর রাতের নিস্তব্ধতায় যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন আমি ল্যাম্পের আলোয় কাপড়ে সুঁই-সুতো দিয়ে ফুল তুলতাম। চোখের জল আর সুতোর রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত।
​কষ্ট হতো যখন ছোট মেয়েটা খিদের জ্বালায় রাতে কাঁদত, আর আমি দেখতাম আমার বড় তিন মেয়ে একে অপরের হাত ধরে ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তাদের চোখে একটাই প্রশ্ন—বাবা কেন আমাদের নিতে এল না? আমি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না, কিন্তু মনে মনে
লেখকের পেইজের নাম The Story Haven
বলতাম, "তোমাদের বাবাকে একদিন আফসোস করতে হবে তোমাদের হারিয়ে।"
​অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই পাড়ার দু-একজন মহিলা আমার কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে অর্ডার দিতে শুরু করলেন। কিন্তু আসল লড়াইটা ছিল তখন, যখন শফিকের বড় ভাই অর্থাৎ আমার ভাসুর একদিন হঠাৎ আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলেন। তিনি কোনো সমবেদনা জানাতে আসেননি, এসেছিলেন এক চরম অপ*মানজনক প্রস্তাব নিয়ে।
​তিনি বললেন, "শফিক তো তোমাকে আর নিতে চায় না। তবে সে বলেছে, বড় দুই মেয়েকে যদি নানীর কাছে রেখে আসতে পারো, তবে সে তোমাকে আর ছোট দুটাকে নিয়ে সংসার করবে। কারণ চার মেয়ে পালার ক্ষমতা তার নেই।"
​আমার তখন হাত কাঁপছিল রাগে..

চলবে...

ঘুরে_দাড়ানোর_গল্প
পর্ব ০১
লেখক The_Story_Haven

প্রথম পর্ব ভালো লেগে থাকলে দয়া করে কমেন্ট করুন। তাহলে খুব শীঘ্রই পরবর্তী পর্ব পাবেন।

প্রাপ্য_অধিকার পর্ব ০৪ +৫লেখক The_Story_Haven সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত অস্থিরতা দিয়ে। রাকেশের সেই রাতের মেসেজটা আমার মা...
25/04/2026

প্রাপ্য_অধিকার
পর্ব ০৪ +৫
লেখক The_Story_Haven

সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত অস্থিরতা দিয়ে। রাকেশের সেই রাতের মেসেজটা আমার মাথার ভেতর বি*ষাক্ত ভ্রমরের মতো গুঞ্জন করছিল। আমি জানি, রাকেশ দমে যাওয়ার পাত্র নয়। ও সেই জাতের মানুষ, যারা নিজে ডুবলে অন্যকে ডুবিয়ে ছাড়তে চায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যান্ডেজটা একটু ঠিক করে নিলাম। আজ আমি হালকা ক্রিম দিয়ে দাগটা ঢাকার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু করতে পারলাম না; বরং ওটা থাকুক আমার সাহসের স্মারক হিসেবে।
অফিসে ঢুকতেই কলিগদের চোখের চাউনি বদলে যেতে দেখলাম। পিনপতন নীরবতা। লবি পার হওয়ার সময় কানে এল ফিসফাস। আমি আমার কিউবিকলে গিয়ে বসতেই আমাদের এইচআর ম্যানেজার বিকাশ বাবু আমাকে কেবিনে ডাকলেন। বিকাশের সাথে রাকেশের আগে থেকেই সখ্য ছিল, মাঝেমধ্যে ওরা একসাথে গলফ খেলতে যেত।
কেবিনে ঢুকতেই বিকাশ বাবু গম্ভীর মুখে একটা ফাইল নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, "মীরা, তোমাকে আমরা দক্ষ কর্মী হিসেবে জানি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন আর কর্মজীবন আলাদা রাখাটা জরুরি। আজ সকালে তোমার নামে একটা ইমেইল এসেছে, সাথে কিছু ছবি আর অডিও ক্লিপ।"
আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। "কীসের ইমেইল স্যার?"
তিনি ল্যাপটপটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। স্ক্রিনে যা দেখলাম, তাতে আমার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। রাকেশ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এডিট করে কিছু অডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে, যেখানে মনে হচ্ছে আমি ওকে হু*মকি দিচ্ছি এবং আমাদের অফিসের ইন্টারনাল কিছু ডেটা লিক করার কথা বলছি। এমনকি আমি যে কাল রাতে পুলিশ নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম, সেটাকে ও ‘বিপ*জ্জনক মা*নসিক ভারসাম্যহীনতা’ হিসেবে রটিয়েছে।
বিকাশ বাবু বললেন, "মীরা, ম্যানেজমেন্ট এই মুহূর্তে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তোমাকে সাময়িক বরখাস্ত (Suspend) করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তদন্ত শেষ হচ্ছে।"
আমার ভেতরটা একবার দুলে উঠল, কিন্তু ভেঙে পড়লাম না। আমি সোজা ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "স্যার, রাকেশ ভার্মা একজন মিথ্যেবাদী এবং একজন অ্যাবিউসার। কাল সকালে ও আমার মুখে গরম চা ছুড়ে মে**রেছে। এই দেখুন আমার ক্ষ*ত।" আমি ব্যান্ডেজটা সরিয়ে দেখালাম। "আর ওর পাঠানো অডিওগুলো যে ফেক, সেটা কোনো ফরেনসিক এক্সপার্ট অনায়াসেই বলে দেবে। আপনি কি একজন অপ*রাধীর কথা শুনে আমার আট বছরের ক্যারিয়ার এক নিমেষে শেষ করে দেবেন?"
বিকাশ বাবু নিরুত্তর। আমি বুঝতে পারলাম, রাকেশ শুধু মেইল করেনি, হয়তো ওপরমহলে ফোন করে অনেক টাকা বা উপকারের লোভ দেখিয়েছে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে আমার আইডি কার্ডটা টেবিলের ওপর রেখে বেরিয়ে এলাম।
অফিস থেকে বের হওয়ার সময় লিফটে নিপার সাথে দেখা হলো। ও হয়তো ওখানেই ওত পেতে ছিল। নিপার মুখে সেই শয়তানি হাসি।
— "কী ভাবি? খুব তো তেজ দেখিয়েছিলে। এখন চাকরিটাও গেল? ভাইয়া বলেছে, যদি তুমি ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসো আর ফ্ল্যাটটা ওর নামে লিখে দাও, তবে ও সব অভিযোগ তুলে নেবে। ভেবে দেখো।"
আমি নিপার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর চোখে তখন জয়ের উল্লাস। আমি খুব নিচু কিন্তু স্থির স্বরে বললাম, "নিপা, তোমার ভাইকে গিয়ে বোলো—সে আমাকে যত নিচে নামানোর চেষ্টা করবে, আমি তত ওপর থেকে ওকে টেনে ধরব। আর হ্যাঁ, তোমার ভাইয়ের ফোনে একটা স্পাই অ্যাপ ছিল যেটা সে আমার ফোনে ইন্সটল করেছিল আমার ওপর নজর রাখতে। কিন্তু কাল রাতে আমি সেটা হ্যাক করে ওর নিজের সব কল রেকর্ড আর চ্যাটের ব্যাকআপ নিয়ে নিয়েছি। ওর এই নোংরা ইমেইলটার জবাব আমি দেব, তবে অফিসের ডেস্কে বসে নয়, কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।"
নিপার হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে থতমত খেয়ে বলল, "কী... কীসের ব্যাকআপ?"
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে এলাম। আসলে আমি কোনো হ্যা*কার নই, কিন্তু অ্যাকাউন্টিং এর সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে রাকেশের পাসওয়ার্ড আর কিছু সিকিউরিটি কোড আমার জানা ছিল। কাল রাতে আমি ওর ক্লাউড স্টোরেজ থেকে এমন কিছু জিনিস পেয়েছি, যা শুধু আমাদের সংসার নয়, ওর ব্যবসাকেও তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাসায় ফিরে আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। রাকেশের ক্লাউড ড্রাইভে একটা ফোল্ডার আছে যার নাম ‘Project-X’। সেখানে দেখলাম, ও গত কয়েক বছর ধরে দামী গাড়ির পার্টস বদলে সস্তা পার্টস লাগিয়ে কাস্টমারদের ঠকিয়েছে। এটা এক বিশাল জালিয়াতি।
রাকেশ ভেবেছিল আমাকে নিঃস্ব করে দিলে আমি ওর পায়ে এসে পড়ব। কিন্তু সে জানত না, সে নিজেই তার ধ্বংসের চাবিকাঠি আমার হাতে তুলে দিয়েছে।
আমি পুলিশের সেই অফিসার মহসিন সাহেবকে ফোন করলাম। "হ্যালো স্যার, আমি মীরা বলছি। রাকেশ ভার্মার বিরুদ্ধে আমার কাছে কিছু নতুন তথ্য আছে। কেবল ঘরোয়া সহিং*সতা নয়, এটা এক বড় ধরণের আর্থিক জালিয়াতির মামলা।"
ফোনটা রেখে আমি জানালার দিকে তাকালাম। আকাশটা আজ মেঘলা, যেন এক বিশাল ঝড় ধেয়ে আসছে। রাকেশ আমার মুখে গরম চা ছুড়ে মে*রে ভেবেছিল সে জিতে গেছে। কিন্তু সেই আগু নের শিখা যে তার নিজের ল*ঙ্কা জ্বালিয়ে দেবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি।
সন্ধ্যায় দরজার বাইরে ভারি বুটের শব্দ শোনা গেল। এবার আর কোনো ভয় নেই। আমি জানি, এবার জয়টা আমারই হবে...

চলবে...

পর্ব ০৫
লেখক The_Story_Haven

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই আকাশটা কেমন ঘোলাটে হয়ে এল। বাতাসের ঝাপটায় জানালার পর্দাগুলো উড়ছে, ঠিক যেমনটা উড়ছে আমার বুকের ভেতরের অশান্ত ঝড়। কিন্তু আজ সেই ঝড়ে কোনো হাহাকার নেই, আছে শুধু এক ঠান্ডা প্রতিশোধের পরিকল্পনা। রাকেশ ভেবেছিল আমার চাকরিটা কেড়ে নিলেই আমি খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ওর চরণে গিয়ে পড়ব। ও জানত না, ডানাবিহীন পাখিও নখ দিয়ে আঁচড়ে দিতে জানে।
রাত আটটা নাগাদ আমার ল্যাপটপে মহসিন সাহেবের একটা মেসেজ এল— "আমরা তৈরি। আপনার দেওয়া প্রমাণগুলো প্রাথমিক তদন্তে সঠিক বলে মনে হচ্ছে।"
ঠিক তখনই দরজার বেলটা বেজে উঠল। অদম্য সাহসে বুক বেঁধে দরজা খুললাম। সামনে রাকেশ দাঁড়িয়ে। চোখে সেই চেনা ক্রুরতা, কিন্তু ঠোঁটে এক বিজয়ী হাসি। ও একাই এসেছে, সাথে নিপা নেই।
— "ভেতরে আসতে দেবে মীরা? নাকি এখনো সেই জেদ ধরে রাখবে?" ওর গলায় একটা তাচ্ছিল্য।
আমি সরে দাঁড়ালাম। ও দর্পভরে ড্রয়িং রুমে ঢুকে সোফায় পা তুলে বসল, যেন ও কোনো হারানো রাজ্য উদ্ধার করতে এসেছে।
— "অফিস থেকে তো লা*থি খেয়ে বেরোলে," ও আয়েশ করে বলল, "এখন তো বুঝছ, আমার সাহায্য ছাড়া তোমার এই তাসের ঘর টিকবে না। নিপা বলছিল তুমি নাকি কীসব হ্যা*কিং-এর ভ*য় দেখাচ্ছ? শোনো মীরা, বেশি চালাকি কোরো না। ফ্ল্যাটটা কাল আমার নামে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি সই করে দাও, আর একটা ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও রেকর্ড করো—তাহলে হয়তো আমি ওসব অডিও ক্লিপ অফিস থেকে তুলে নেব।"
আমি ওর সামনে একটা ফাইল রাখলাম। ওটা কোনো সই করার কাগজ ছিল না। ওটা ছিল ওর সেই 'Project-X'-এর কিছু নথিপত্র আর ব্যাংক স্টেটমেন্টের স্ক্রিনশট।
রাকেশের হাসিটা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেল। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। ও ফিসফিস করে বলল, "এসব কোত্থেকে পেলে তুমি?"
— "তুমি যখন রাতে ঘুমাতে, তখন তোমার ফোনের পিন কোড আমি আন্দাজ করে নিয়েছিলাম অনেক আগেই," আমি খুব শান্ত গলায় বললাম। "গত তিন বছরে তুমি যে সাতাশ জন কাস্টমারকে ঠকিয়েছ, অরিজিনাল ইঞ্জিন পার্টস বদলে সেকেন্ড হ্যান্ড পার্টস লাগিয়েছ—তার সব হিসেব এখানে আছে। এমনকি সেই ডিলারদের ফোন নম্বরও আমার কাছে আছে, যারা তোমাকে এই দুই নম্বর মাল সাপ্লাই দিত।"
রাকেশ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সোফা থেকে ঝাঁপিয়ে এসে আমার গ*লা চে*পে ধরল। "তোর এত বড় সাহস! তুই আমাকে জেলে পাঠাবি? তোকে আজ মে**রেই ফেলব আমি!"
ওর আঙ্গুলের চাপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। গলার ব্যান্ডেজটা ছিঁড়ে গেল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে থেকে মহসিন সাহেবের গম্ভীর আওয়াজ এল— "পুলিশ! দরজা খুলুন!"
রাকেশের হাত শিথিল হয়ে গেল। ওর চোখে তখন আমি মৃ**ত্যুর ছায়া দেখতে পেলাম। ও জানত না যে আমি আগেই পুলিশকে কল দিয়ে রেখেছিলাম এবং ড্রয়িং রুমের একটি কোণে আমার ল্যাপটপের ক্যামেরা দিয়ে পুরো দৃশ্যটা রেকর্ড হচ্ছিল।
পুলিশ ভেতরে ঢুকে রাকেশকে হাতকড়া পরাল। মহসিন সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মীরা ম্যাডাম, আপনি ঠিক আছেন তো?"
আমি মাথা নেড়ে বললাম, "আমি ঠিক আছি স্যার। কিন্তু আমার কাছে আরও কিছু আছে।"
আমি ড্রয়ার থেকে একটা রেকর্ডার বের করলাম। সেখানে নিপার সাথে আমার বিকেলের কথোপকথন রেকর্ড করা ছিল, যেখানে সে স্বীকার করেছিল যে রাকেশ মিথ্যে ইমেইল পাঠিয়ে আমার চাকরি খেয়েছে। এটা ছিল 'কনস্পিরেসি' বা ষড়যন্ত্রের এক অকাট্য দলিল।
রাকেশকে যখন টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ও পা*গলের মতো চিৎকার করছিল, "মীরা, তুই পস্তাবি! তোকে কেউ বাঁচাবে না!"
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমি তো কবেই পস্তানো শুরু করেছিলাম রাকেশ, যেদিন তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। আজ থেকে আমার পস্তানোর দিন শেষ, তোমার শুরু।"
রাকেশকে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নিপা এল। তার ভাইয়ের গ্রেফতারের খবর সে পেয়ে গেছে। সে দরজায় আছড়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। "ভাবি, প্লিজ কেসটা তুলে নাও। ভাইয়া মরে যাবে জেলে। আমাদের আর কেউ নেই।"
আমি ওর দিকে তাকালাম। এই সেই মেয়ে, যে কাল পর্যন্ত আমার ক্রেডিট কার্ড আর পারফিউমের জন্য লালায়িত ছিল। আমি কোনো কথা না বলে ওর সামনে ওর সেই ব্যাগটা ছুড়ে দিলাম যেটা ও কাল নিতে ভুলে গিয়েছিল।
— "তোমার ভাইয়ের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে নিপা। আর তুমি? তুমি তো কেবল একটা পরজীবী। নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো, মানুষের হক মে*রে খাওয়া বন্ধ করো।"
রাত তখন গভীর। আমি একা সেই বিশাল ফ্ল্যাটে। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুরু হয়েছে। পোড়া ক্ষ*তের জ্বালাটা আজ আর অতটা তীব্র মনে হচ্ছে না। আমি ল্যাপটপ খুলে আমার অফিসের বসকে একটা মেইল লিখলাম। সমস্ত প্রমাণ সহ জানালাম যে রাকেশের অভিযোগগুলো ছিল সম্পূর্ণ বানোয়াট।
আগামীকাল হয়তো আমার চাকরিটা ফিরে পাব, হয়তো পাব না। কিন্তু আমি একটা জিনিস ফিরে পেয়েছি যা হারানো চাকরির চেয়ে অনেক বেশি দামি। আমার আত্মসম্মান।
বিছানায় শোয়ার আগে আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। ব্যান্ডেজহীন সেই লালচে দাগটা এখনো আছে। কিন্তু আমার চোখের সেই আতঙ্কটা নেই। সেখানে এখন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা আর প্রশান্তি।
আগামীকাল থেকে কোর্ট-কাচারি, উকিল আর সমাজের হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আমাকে। কিন্তু আমি জানি, আমি একা নই। আমি মীরা শর্মা, যে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে উঠতে জানে

চলবে...

সবাই একটু কমেন্ট করবেন প্লিজ। তাহলে আরো তারাতাড়ি পরবর্তী পর্ব পাবেন।

কিছুক্ষণ আগে মা হঠাৎ করে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—এভাবে ওকে কখনো দেখিনি। বলল, “ভাব তো আজ কে এসেছিল ...
24/04/2026

কিছুক্ষণ আগে মা হঠাৎ করে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম—এভাবে ওকে কখনো দেখিনি। বলল, “ভাব তো আজ কে এসেছিল আমাদের বাড়ি!”
আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কে?”
মা চোখ টিপে বলল, “আমাদের পাশের বাড়ির নাজমা খালা… আর বুঝলি, তোকে ওনার মেয়ে হিয়ার জন্য বলতে এসেছে।”

আমি হেসে ফেললাম, চাপা দিতে চাইলেও পারলাম না। সত্যি বলতে, হিয়া এমন মেয়ে—যাকে এলাকার প্রায় সব ছেলেই পছন্দ করে। অথচ সে নাকি আমাকে বেছে নিয়েছে!

সব কিছু যেন খুব সহজেই এগোতে লাগল। আমাদের পরিবার গেল ওদের বাড়ি, কথা হলো, আর এক মাসের মধ্যেই বাগদান। হিয়া ছিল খুবই শান্ত, সহজ-সরল—কোনো অহংকার নেই, কোনো বাড়াবাড়ি নেই।

আমি ধীরে ধীরে ওর কাছে খুলে বললাম আমার জীবনের কথা। বললাম, আমার দুইজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে—ইয়াসিন আর হামিদ। আর ওর পৃথিবী যেন শুধু ওর পরিবারেই সীমাবদ্ধ।

এরপর আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের পরের দিন সকালেই আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বের হলাম। নতুন জীবনের আনন্দে ভেসে যাচ্ছিলাম। সব কিছু তাদের সাথে শেয়ার করলাম—বন্ধুত্বের সেই পুরনো অভ্যাস।

তিন মাস কেটে গেল।

একদিন আড্ডায় বসে আছি ইয়াসিনের সাথে, হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল—
“মাহিন নেমেছে, তাড়াতাড়ি উঠে আসো।”
আমি পড়ে শেষ করার আগেই মেসেজটা উধাও হয়ে গেল।

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। মাথা ঘুরে গেল। এই মেসেজটা কার জন্য ছিল?

আমি দৌড়ে বাড়ির দিকে গেলাম, কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলাম—কেউ ঢোকেনি। বুঝলাম, সে হয়তো ভুল করে পাঠিয়েছিল, তারপর মুছে ফেলেছে।

এরপর থেকে আমি বদলে গেলাম। ওকে গোপনে নজর রাখতে লাগলাম। একদিন সুযোগ পেয়ে ওর ফোন চেক করলাম—সব মুছে ফেলা।

সেদিন বুঝলাম, কিছু একটা ঠিক নেই।

কয়েকদিন চুপচাপ থাকার পর ইয়াসিন সব বুঝে ফেলল। চাপ দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত আমি সব খুলে বললাম।
সে বলল, “চিন্তা করিস না, ফোনটা ঠিক করার নাম করে আমার কাছে আন। আমি সব বের করে ফেলব।”

আমি ওর কথা মতো করলাম।

পরের দিন যখন ইয়াসিন আমাকে ডাকল, ওর মুখটা অদ্ভুত ফ্যাকাসে। ফোনটা হাতে দিয়ে বলল, “এই চ্যাটটা দেখ।”

আমার হাত কাঁপছিল। নম্বরটা দেখে জমে গেলাম—ওটা হামিদের।

আমার দুই সবচেয়ে কাছের মানুষ…!

আমি রাগে অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ইয়াসিন থামাল। বলল, “শান্ত থাক। পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।”

ও একটা পরিকল্পনা করল—হামিদকে বাড়িতে ডাকা হবে, আর হাতেনাতে ধরা হবে।

সবকিছু ঠিকঠাক মতোই হলো।

সেদিন আমি আগে থেকেই বাসায় ছিলাম। দরজা খোলা ছিল। হামিদ এলো, ভাবল আমি নেই। আমি বাথরুমে লুকিয়ে ছিলাম। সে ঢুকল ঘরে, আর দেখল হিয়া সেখানে।

আমি বের হয়ে এলাম।

ইয়াসিনও ঢুকে পড়ল ভিডিও করতে।

সবকিছু মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।

হামিদ পালাতে চাইল—আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। রাগ, বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান—সব মিলিয়ে আমি ছুরি দিয়ে আঘাত করলাম।

সে আমার সামনে পড়ে গেল।

হিয়া চিৎকার করতে লাগল। চারপাশে মানুষ জড়ো হলো। আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম—
“ওদের আমি হাতেনাতে ধরেছি!”

এরপর শুরু হলো তদন্ত।

কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিল।

তদন্তে বের হলো—হিয়ার ফোনে একটা অ্যাপ ছিল, যেটা দিয়ে অন্য কেউ ফোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আর হিয়া বলল—
“ইয়াসিন আমাকে বিয়ের আগে প্রস্তাব দিয়েছিল, আমি না বলেছিলাম। বিয়ের পরও চেষ্টা করেছিল… আমি ওকে হুমকি দিয়েছিলাম মাহিনকে বলে দেব।”

আমার মাথার ভেতর যেন সবকিছু ভেঙে পড়ল।

তাহলে… সত্যিটা আসলে কী?

চলবে...?
ভাঙা_আস্থা পর্ব ১
গল্প_ঘর

গর্ভবতী মেয়েকে দেখতে বাবা ১১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসে দেখেন তার মেয়ে অসুস্থ শরির নিয়ে বড় জায়ের রুম পরিষ্কার করতাছে।বা...
24/04/2026

গর্ভবতী মেয়েকে দেখতে বাবা ১১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসে দেখেন তার মেয়ে অসুস্থ শরির নিয়ে বড় জায়ের রুম পরিষ্কার করতাছে।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন আব্দুল করিম। এতদূর পথ—বাস, রিকশা, আবার হেঁটে—এসে শরীরটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু মনের ভেতর যে অস্বস্তিটা জমে ছিল, সেটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি ভেবেছিলেন, মেয়েকে দেখবেন—হয়তো একটু হাসিমুখে, হয়তো একটু যত্নে রাখা হয়েছে। কিন্তু দরজার ভেতর থেকে যে দৃশ্যটা তিনি দেখলেন, সেটা তার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল।
তার মেয়ে মেহজাবিন—যে মেয়েটা ছোটবেলা থেকে একটু জ্বর হলেই তিনি নিজের হাতে মাথায় পানি দিতেন—সে আজ ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে একটা বড় রুমের মেঝে মুছছে। পেটটা স্পষ্টই ভারী হয়ে উঠেছে, মুখটা ফ্যাকাশে, চোখের নিচে কালি। তবুও সে থামেনি।
“মেহু…” খুব আস্তে ডাকলেন তিনি।
মেহজাবিন মাথা তুলে তাকাতেই যেন চমকে উঠল। “বাবা!” সে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও একটু টলে গেল।
আব্দুল করিম ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন। “এই অবস্থায় তুই এসব করছিস কেন?”
মেয়েটা একটু জোর করে হাসল, যেন কিছুই হয়নি। “কিছু না বাবা… এমনি একটু কাজ করছিলাম।”
ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে বড় জা শারমিন বের হয়ে এল। পরিপাটি করে সেজে, হাতে অফিস ব্যাগ। সে একবার তাকিয়ে বলল, “ওহ, আপনি এসেছেন? ভালোই হয়েছে। আপনার মেয়েকে একটু কাজ করতে শিখতে হবে। সংসার করতে হলে তো এসব লাগেই।”

আব্দুল করিমের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তবে এই অবস্থায়?”

শারমিন কাঁধ ঝাঁকালো। “আমি তো চাকরি করি আঙ্কেল। সারাদিন বাইরে থাকি। ঘরের কাজ কে করবে বলেন?”
এই কথাগুলো এত সহজভাবে বলা হলেও, তার ভেতরে একটা কষ্টের খোঁচা লুকিয়ে ছিল। আব্দুল করিম সেটা অনুভব করলেন। কিন্তু তিনি অতিথি—এই বাড়িতে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি—তাই সরাসরি কিছু বলতেও পারলেন না।
মেহজাবিন তাড়াতাড়ি বলল, “বাবা, তুমি বসো। আমি চা করে আনছি।”
“তুই বস,” কড়া গলায় বললেন তিনি। “আমি চা খেতে আসিনি।”
ঘরের ভেতর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল।
মেহজাবিন চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে পানি জমে উঠছে, কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে। বাবা যেন কিছু বুঝতে না পারেন—এই চেষ্টাটাই তার চোখে স্পষ্ট।
কিন্তু বাবা কি বুঝবেন না?
আব্দুল করিম ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালেন। ঘরটা পরিপাটি, কিন্তু কোথাও একটা উষ্ণতার অভাব। যেন সবকিছু নিয়মমাফিক, কিন্তু ভালোবাসা নেই।
“তোর শরীর কেমন?” তিনি নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
“ভালো আছি,” খুব ছোট করে উত্তর দিল মেহজাবিন।
“ডাক্তার দেখাস?”
“হ্যাঁ… মানে… সময় পেলে যাই…”
এই ‘সময় পেলে’ কথাটা তার কানে খুব খারাপ লাগল। তিনি বুঝলেন, মেয়েটা ঠিকমতো চিকিৎসাও পাচ্ছে না।
এমন সময় মেহজাবিনের স্বামী রাশেদ ঘরে ঢুকল। সে বাবাকে দেখে একটু থমকে গেল, তারপর কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলল, “ওহ, আব্বা! আগে জানালে আমি নিতে যেতাম।”
আব্দুল করিম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি নিজেই আসতে পারি এখনও।”
রাশেদ একটু অস্বস্তি বোধ করল। “না মানে… আপনি কষ্ট করলেন…”
“কষ্ট তো আমার মেয়ে করছে,” কথাটা হঠাৎ করেই বেরিয়ে গেল তার মুখ থেকে।
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
রাশেদ একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আব্বা, আপনি বিষয়টা ভুল বুঝছেন। ও তো ঘরের বউ, একটু কাজ করতেই পারে।”
“এই অবস্থায়?” আবার একই প্রশ্ন।
রাশেদ এবার গলায় একটু রাগ মিশিয়ে বলল, “সবাই তো করে। আমার ভাইয়ের বউ চাকরি করে, তাই মেহজাবিন একটু বেশি দেখে।”
মেহজাবিন তাড়াতাড়ি বলল, “বাবা, তুমি বসো না… প্লিজ…”
সে বুঝতে পারছিল, পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে।
আব্দুল করিম মেয়ের দিকে তাকালেন। সেই ছোটবেলার মেয়ে—যে একটুখানি কষ্ট পেলেই তার কাছে এসে জড়িয়ে ধরত—আজ নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যদের রক্ষা করছে।
তার বুকটা হঠাৎ খুব ভারী হয়ে উঠল।
“তুই আমার সাথে চল,” হঠাৎ বললেন তিনি।
মেহজাবিন অবাক হয়ে তাকাল। “কোথায়?”
“বাড়ি।”
রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “এটা কি সম্ভব? এখন ও যাবে কীভাবে? আমাদের সংসার আছে, দায়িত্ব আছে।”
“দায়িত্ব শুধু আমার মেয়ের?” শক্ত গলায় বললেন আব্দুল করিম।
কেউ উত্তর দিল না।
মেহজাবিন আস্তে করে বলল, “বাবা, আমি ভালো আছি। তুমি দুশ্চিন্তা করো না।”
এই ‘ভালো আছি’ কথাটা এতটাই দুর্বল ছিল যে, সেটা শুনে কারও বিশ্বাস হওয়ার কথা না। তবুও সে বলল—কারণ এটাই তার শেখা।
আব্দুল করিম বুঝলেন, এই মুহূর্তে জোর করলে মেয়েটা
লেখকের পেইজের নাম The Story Haven
আরও বিপদে পড়বে। তাই তিনি চুপ করে গেলেন।
“ঠিক আছে,” তিনি বললেন, “আমি আজ থাকি এখানে।”
এই কথায় সবাই একটু অবাক হল।
রাশেদ বলল, “থাকবেন?”
“হ্যাঁ। অনেকদিন পর মেয়ের কাছে এসেছি। একটু সময় কাটাই।”
কিন্তু তার ভেতরে অন্য কিছু চলছিল।
তিনি ঠিক করলেন—আজ তিনি সব দেখবেন, সব বুঝবেন। তার মেয়ে সত্যিই ভালো আছে, নাকি শুধু অভিনয় করছে—সেটা তিনি নিজের চোখে দেখবেন।
আর যদি সত্যিটা তার ভ*য় মতোই হয়…
তাহলে তিনি চুপ করে থাকবেন না।
সেদিন রাতটা যেন অদ্ভুত ভারী হয়ে নেমে এল সেই বাড়িতে। মেহজাবিন রান্নাঘরে ব্যস্ত, শরীর খারাপ থাকা সত্ত্বেও একের পর এক কাজ করে যাচ্ছে। আর দূরে দাঁড়িয়ে তার বাবা সবকিছু দেখছেন—নীরবে, গভীরভাবে।
তার চোখে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন—
“আমি কি আমার মেয়েকে ভুল জায়গায় দিয়ে ফেলেছি?”

চলবে…

মেয়ের_বাড়ি
পর্ব ০১
লেখক The_Story_Haven

খুব তারাতাড়ি পরবর্তী পর্ব পড়তে চাইলে কমেন্ট করুন প্লিজ।

আমি কখনোই আমার স্বামীকে বলিনি যে তার “প্রেমিকা” আসলে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। ঝগড়া করে পাড়া মাথায় তোলার বদলে আমি...
24/04/2026

আমি কখনোই আমার স্বামীকে বলিনি যে তার “প্রেমিকা” আসলে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল। ঝগড়া করে পাড়া মাথায় তোলার বদলে আমি তাদের দুজনকে একদিন বাড়িতে দামী ডিনারে আমন্ত্রণ জানালাম। তারা টেবিলের নিচে লুকিয়ে হাত ধরে ছিল, আর আমি এমন ভান করছিলাম যেন কিছুই দেখিনি।

হালকা হাসি মুখে আমি তাকে একটা ছোট নীল বাক্স এগিয়ে দিলাম।

হেসে বললাম, “ধন্যবাদ তোমাকে, শুচি… তোমার এই ‘বিশ্বস্ততার’ জন্য।”

সে ভেবেছিল ভেতরে হয়তো দামী কোনো উপহার থাকবে। কিন্তু বাক্স খুলতেই তার মুখের সব রং উধাও হয়ে গেল। আমার স্বামী এক মুহূর্তে বুঝে গেল, আমি চিৎকার না করেই তার পুরো জীবন ভেঙে দিয়েছি।

কায়রোতে গোপন কথাই আসল শক্তি। এখানে আমরা প্রকাশ্যে চিৎকার করি না, রাস্তায় নাটক করি না। যখন জীবন ভেঙে যায়, আমরা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি—আর নিশ্চিত করি, আঘাতটা যেন ঠিক তাদেরই লাগে যারা আমাদের ভেঙেছে।

এটা শুধু ভাঙা হৃদয়ের গল্প নয়—এটা হিসাব মেটানোর গল্প।

আমার নাম লীলা। বয়স চৌত্রিশ। আমি একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। মানুষের ঘর বদলে দেওয়াই আমার কাজ। দেয়ালের ফাটল ঢেকে দিই দামী ওয়ালপেপারের আড়ালে, আর ভাঙা জিনিসকে নতুন রূপে “স্টাইল” বানিয়ে দিই।

আমার স্বামী একজন বড় আইনজীবী। স্মার্ট, ভদ্র, আর ভীষণ হিসেবি। নিউ কায়রোর আমাদের ফ্ল্যাট, সামনে সাদা মার্সিডিজ—সবকিছু দেখে সবাই ভাবত আমরা একদম পারফেক্ট দম্পতি।

তারপর এল মিরনা।

শুধু বন্ধু না, আমার ছায়ার মতো ছিল। পনেরো বছরের সম্পর্ক আমাদের। ইউনিভার্সিটি জীবনের শুরু থেকে সে ছিল পাশে। আমার প্রথম ভাঙা বিয়ের সময় সে ছিল আমার শক্তি। আমার মেয়ে লামা জন্মানোর পর রাত জেগে আমাকে সাহায্য করেছে। আমি ভাবতাম, সে আমার নিজের রক্তের মতোই আপন।

কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।

একদিন সকালে সবকিছু বদলে গেল। কফির গন্ধে ভরা ঘরে আমার স্বামী শাওয়ার নিচ্ছিলেন। তার ট্যাবলেটটা টেবিলে খোলা ছিল। আমি ইচ্ছা করে কিছু খুঁজিনি, শুধু সময় দেখতে গিয়েছিলাম।

কিন্তু একটা মেসেজ চোখে পড়ে গেল।

রাত ৩:৪২ মিনিটে মিরনা লিখেছে— “তোমার পারফিউম এখনো আমার বালিশে লেগে আছে। লীলা কিছুই বুঝতে পারে না, তুমি বলো তুমি কাজে আটকে আছো।”

তার রিপ্লাই— “ও কিছুই বুঝতে পারে না। রাতে ফোর সিজনস হোটেলে বুকিং করেছি। ভালোবাসি।”

সবকিছু এক মুহূর্তে থেমে গেল আমার ভেতরে। মনে হলো শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে আলোটা অন্ধকার হয়ে গেল।

আমি জানতাম, আমি যদি তখনই চিৎকার করি, তাহলে সবকিছু উল্টো আমার দিকেই ফিরে আসবে। আমাকে দুর্বল বানিয়ে দেবে। তাই আমি শান্ত থাকলাম।

ট্যাবলেটটা ঠিক জায়গায় রাখলাম। বিছানা গুছালাম। রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানালাম। এমনভাবে দাঁড়ালাম যেন কিছুই হয়নি।

আমার স্বামী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। গায়ে তখনো অন্য নারীর গন্ধ স্পষ্ট। এসে আমার কপালে চুমু দিলেন।

বললেন, “সকালটা সুন্দর হোক।”

আমি হেসে বললাম, “তোমারও ভালো কাটুক।”

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—তার পতনের শুরু হয়ে গেল।

দিনগুলো স্বাভাবিকের মতো চলতে লাগল। আমি আগের মতোই হাসলাম, কথা বললাম, অতিথি ডাকলাম, এমনকি মিরনাকেও নিয়ে মিষ্টি আচরণ করলাম। কেউ বুঝতেই পারল না, আমার ভেতরে কী চলছে।

কিন্তু আমি ভুলিনি।

আমি সব মনে রেখেছিলাম—প্রতিটা মেসেজ, প্রতিটা রাতের মিথ্যে, প্রতিটা বিশ্বাসঘাতকতা।

তারপর এলো সেই রাত।

আমি তাদের দুজনকেই আমন্ত্রণ জানালাম এক ডিনারে। আলো মৃদু, টেবিল সাজানো দামী খাবারে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল নিখুঁত একটা সন্ধ্যা।

কিন্তু ভেতরে ছিল হিসেব।

তারা হাসছিল, কথা বলছিল, এমনকি নিজেদের ভেতরের সম্পর্ক লুকানোর চেষ্টা করছিল না। টেবিলের নিচে হাত ধরা, চোখে চোখ পড়া—সবই আমি দেখছিলাম, কিন্তু কিছু বলছিলাম না।

আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম।

ডিনার শেষের দিকে আমি উঠে গেলাম। হাতে একটা ছোট নীল বাক্স।

হেসে বললাম, “এটা তোমার জন্য, শুচি। তোমার বিশ্বস্ততার স্মৃতি।”

সে খুশি হয়ে বাক্স নিল। আমার স্বামী পাশে বসে দেখছিলেন, তার মুখে অস্বস্তির ছায়া।

শুচি ধীরে ধীরে বাক্স খুলল।

ভেতরের জিনিসটা দেখতেই তার হাত কেঁপে উঠল। মুখের হাসি মুহূর্তে হারিয়ে গেল।

আমার স্বামী তাকিয়ে রইলেন। কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না।

আমি শান্ত গলায় বললাম, “আমি সব জানি।”

ঘরের বাতাস যেন থমকে গেল।

সেই রাতে আমি চিৎকার করিনি। কোনো নাটক করিনি। শুধু সত্যটা রেখে দিলাম তাদের সামনে—নীরব, পরিষ্কার, এবং ভয়ংকর।

কারণ কেউ যখন বিশ্বাস ভাঙে, প্রতিশোধ সবসময় শব্দ করে আসে না।

কখনো কখনো প্রতিশোধ আসে নীরবে… আর সেটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

চলবে...?
ভাঙা_আয়না
গল্প_ঘর

প্রাপ্য_অধিকার পর্ব ০২ +৩লেখক The_Story_Haven রাকেশ যখন ড্রয়িং রুমে পা রাখল, তার চোখেমুখে ছিল এক ধরণের তাচ্ছিল্যভরা আধিপ...
24/04/2026

প্রাপ্য_অধিকার
পর্ব ০২ +৩
লেখক The_Story_Haven

রাকেশ যখন ড্রয়িং রুমে পা রাখল, তার চোখেমুখে ছিল এক ধরণের তাচ্ছিল্যভরা আধিপত্য। পেছনে নিপা, তার মুখে এক চিলতে ধূর্ত হাসি। হয়তো সে মনে মনে ভেবে রেখেছিল আজ আমার কোন কোন শাড়ি বা গয়নাগুলো সে নিজের দখলে নেবে। কিন্তু দরজার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন পুলিশ কনস্টেবলকে দেখে রাকেশের সেই আত্মবিশ্বাসী চেহারাটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তার হাতের চাবির গোছাটা মেঝেতে পড়ে টুং করে একটা শব্দ হলো।
​সে তোতলামি করে বলল, "আপনারা? মানে... এখানে কী হচ্ছে?"
​আমি তখন সোফায় বসেছিলাম। আমার গাল আর গলায় সাদা ব্যান্ডেজ, চোখে প্রচণ্ড জ্বালা। আমি কোনো কথা বললাম না। আমার হয়ে কথা বললেন সাব-ইন্সপেক্টর মহসিন সাহেব। তিনি খুব ধীরস্থির গলায় বললেন, "মি. রাকেশ ভার্মা, আপনার স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা এখানে এসেছি। আপনি তাকে মারা*ত্মকভাবে জ*খম করেছেন এবং ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হু*মকি দিয়েছেন।"
​রাকেশ দ্রুত নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। সে হাসার ভান করে বলল, "আরে না স্যার, এটা তো একটা ঘরোয়া ভুল বোঝাবুঝি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটু আধটু কথা কাটাকা*টি তো হয়ই। আর ওই চা... ওটা তো দুর্ঘটনাবশত হাত থেকে পড়ে গেছে।"
​"দুর্ঘটনা?" আমি উঠে দাঁড়ালাম। ব্যথায় আমার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু আমার কণ্ঠস্বর ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত। "চা হাত থেকে পড়লে কাপটা টেবিলের ওপর থাকে, রাকেশ। কিন্তু তুমি কাপটা আমার দিকে ছুড়ে মে*রেছিলে। আর তার চেয়েও বড় কথা, তুমি আমাকে চিকিৎসা করানোর বদলে বলেছিলে—এটাই নাকি আমার শিক্ষা!"
​নিপা মাঝখান থেকে গলার স্বর উঁচিয়ে বলে উঠল, "ভাবি, আপনি বাইরের লোক ডেকে বাড়ির সম্মান এভাবে নষ্ট করছেন? ভাইয়া তো রাগের মাথায়..."
​পুলিশ অফিসার নিপাকে থামিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বললেন, "আপনি মাঝখানে কথা বলবেন না। আমরা এখানে আইনি কাজ করতে এসেছি।"
​রাকেশ দেখল পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে ভাবল হয়তো আমাকে ভয় দেখিয়ে বা আবেগী কথা বলে দমানো যাবে। সে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, "মীরা, মাথা ঠান্ডা করো। তুমি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। একটু রাগ হয়েছিল বলে তুমি পুলিশ নিয়ে আসবে? চলো আমরা ভেতরে গিয়ে কথা বলি।"
​আমি পিছিয়ে গেলাম না। বরং আমার ব্যাগ থেকে একটি ফোল্ডার বের করে তার সামনে ধরলাম। "ভেতরে গিয়ে কথা বলার দিন শেষ, রাকেশ। এই ফ্ল্যাটের মালিকানার কাগজপত্র দেখো। এটা আমি বিয়ের আগে কিনেছিলাম। এই অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটা ইটের ওপর আমার অধিকার। তুমি এখানে থাকতে পারো কেবল আমার দয়ায়। আর সেই দয়া তুমি আজ সকালেই হারিয়ে ফেলেছ।"
​রাকেশের চোখের মণি যেন স্থির হয়ে গেল। সে জানত বাড়িটা আমার, কিন্তু সে হয়তো ভাবেনি আমি কোনোদিন তাকে এটা নিয়ে আক্র*মণ করব। সে ভাবত আমি একটা নিরীহ মেয়ে, যে সব মুখ বুজে সহ্য করবে।
​আমি পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললাম, "স্যার, আমি আমার দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এই মানুষটি যদি এই বাড়িতে থাকে, তবে আমার জীবনের নিরাপত্তা নেই। আমি আপাতত আমার এক বান্ধবীর বাসায় থাকছি, কিন্তু কালকের মধ্যে আমি চাই এই ফ্ল্যাট থেকে ও যেন চলে যায়। নইলে আমি দখলস্বত্ব মামলা করব।"
​রাকেশ এবার চিৎকার করে উঠল, "কী বললি তুই? আমাকে বের করে দিবি? তোর এত বড় সাহস!"
​সে আমার দিকে তেড়ে আসতে চাইল, কিন্তু পুলিশ অফিসাররা তাকে আটকে দিলেন। মহসিন সাহেব বললেন, "মিস্টার রাকেশ, নিজেকে সংযত করুন। আপনার বিরুদ্ধে মা*রধরের অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। এই মুহূর্তে মীরা সাহেব যদি মামলা করেন, তবে আপনাকে থানায় যেতে হবে। তার চেয়ে ভালো হয়, আপনি আপাতত কয়েকদিন বাইরে থাকুন।"
​নিপা পাশে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল। তার সেই দামী পারফিউম আর কার্ডের নেশা তখন ছুটে গেছে। রাকেশ বুঝতে পারল, আজ আর কোনো নাটক কাজ করবে না। তার সেই সুন্দর মুখোশটা পুলিশের সামনে চুরমা*র হয়ে গেছে।
​রাকেশ রাগে গজগজ করতে করতে আলমারি থেকে নিজের কিছু জামাকাপড় একটা ব্যাগে ভরতে লাগল। যাওয়ার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে সে আমার দিকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "খুব অহংকার হয়েছে না মীরা? মনে রেখো, ডি*ভোর্সি মেয়েদের এই সমাজে কোনো দাম নেই। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে তোমাকে।"
​আমি শান্ত গলায় উত্তর দিলাম, "রাস্তায় ঘুরতে হয় কি না তা সময় বলবে। তবে তোমার মতো পশুর সাথে এক ছাদের নিচে থাকার চেয়ে রাস্তায় থাকা অনেক বেশি সম্মানের।"
​রাকেশ আর নিপা বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটটা হঠাৎ খুব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যে ঘরটাকে আমি পরম মমতায় সাজিয়েছিলাম, আজ সেখানে কেবল কান্নার প্রতিধ্বনি আর পো*ড়া চায়ের গন্ধ। আমি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরের অন্ধকার ঢাকা শহরটা দেখা যাচ্ছে। আমার খুব একা লাগছিল, আবার একই সাথে এক অদ্ভুত হালকা অনুভব করছিলাম।
​শরীরের ক্ষতটা হয়তো কিছুদিন পর শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মনের ওপর যে আঁচড় পড়েছে তা সারাজীবন থাকবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—মীরা শর্মা আজ থেকে আর কারো আদেশ পালন করবে না। সে এখন নিজের গল্পের লেখিকা।
​আমি ল্যাপটপটা খুললাম। আমার অফিসের বসকে মেইল করলাম যে আমি ব্যক্তিগত কারণে কয়েকদিন ছুটিতে থাকব। তারপর আমার হার্ডড্রাইভ থেকে আমার অসমাপ্ত গল্পের ফাইলটা বের করলাম। আজ আমি এমন এক অধ্যায় লিখেছি যা আমি নিজেও কখনো কল্পনা করিনি।
​রাত তখন গভীর। আমি ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে সোফায় শুয়ে পড়লাম। আমার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে আসছিল, কিন্তু সেটা কষ্টের জল নয়। সেটা ছিল মুক্তির জল। কাল সকালে যখন সূর্য উঠবে, তখন আমি এক নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হব। যেখানে রাকেশের কোনো চিৎকার নেই, নিপার কোনো লোভ নেই। আছে শুধু আমি আর আমার হারম্ভ না মানা সত্ত্বা।
​কিন্তু আমি জানতাম না, রাকেশ এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। গাজিয়াবাদের সেই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সে হয়তো চলে গেছে, কিন্তু আমার জীবনের ওপর থেকে তার ছায়া সরানোর লড়াইটা কেবল শুরু হলো

চলবে...

পর্ব ০৩
লেখক The_Story_Haven

ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকল, আমার মনে হলো আমি এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি। শরীরটা পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। গাল আর গলার ক্ষ*তটা দপদপ করছে—ওষুধের প্রভাব শেষ হয়ে আসায় জ্বালাটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ব্যান্ডেজের নিচ থেকে উঁকি দেওয়া লালচে চামড়াটা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সেই মুহূর্তের কথা, যখন বিশ্বাস আর সংসার তাসের ঘরের মতো ভে*ঙে পড়েছিল।
​আমি আজ একা। পুরোপুরি একা। কিন্তু এই একাকীত্বে বিষাদের চেয়ে স্বস্তি ছিল বেশি। কেউ আমার ওপর আদেশ দেওয়ার নেই, কেউ আমার উপার্জনের ওপর থাবা বসানোর নেই। আমি রান্নাঘরে গেলাম। সেই টেবিলটা, সেই কাপের ভা*ঙা টুকরো—সব এখনো কালকের বিভীষিকার সাক্ষ্য দিচ্ছে। আমি খুব যত্ন করে ঘরটা পরিষ্কার করলাম। ভা*ঙা কাঁচের টুকরোগুলো যখন ডাস্টবিনে ফেললাম, মনে হলো রাকেশের সাথে আমার আট বছরের মিথ্যে সম্পর্কের অবশিষ্টাংশগুলোও ঝেঁটিয়ে বিদায় করছি।
​সকাল দশটার দিকে আমার মোবাইলে একটা নোটিফিকেশন এল। আমার ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। নিপা। রাকেশ চলে যাওয়ার সময় নিশ্চয়ই আমার কার্ডের ডিটেইলস ওকে দিয়ে গেছে। কিন্তু ওরা জানত না যে আমি কাল রাতেই সব কার্ড ব্লক করে দিয়েছি। একটা তৃপ্তির হাসি আমার ঠোঁটে খেলে গেল। যে মেয়েটা সারাজীবন শুধু দিয়ে গেছে, সে আজ থেকে নিজের অধিকার রক্ষা করতে শিখেছে।
​পরের কয়েক ঘণ্টা কাটল উকিলের সাথে ফোনে কথা বলে। ডি*ভোর্স আর প্রোটেকশন অর্ডার—দুটো নিয়েই এগোতে চাই আমি। আমার উকিল বন্ধু ইশিতা অভয় দিয়ে বলল, "মীরা, তুই একদম ঠিক কাজ করেছিস। ওর মতো লোকগুলোকে এভাবেই শিক্ষা দিতে হয়। তুই চিন্তা করিস না, মেডিকেল রিপোর্টটা আমাদের বড় অ*স্ত্র।"
​বিকেলের দিকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। বুকটা ধক করে উঠল। রাকেশ কি ফিরে এল? সাহস সঞ্চয় করে দরজার ফুটো দিয়ে তাকালাম। না, রাকেশ নয়। নিপা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে এক ধরণের ধূর্ত মিনতি।
​আমি দরজা খুললাম, তবে গ্রিলটা আটকে রাখলাম।
— "কী চাই?" আমার কণ্ঠস্বরে এক ফোঁটা মায়া ছিল না।
— "ভাবি, ভাইয়ার খুব শরীর খারাপ। কাল রাতে ও ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেনি। ওর কিছু জরুরি অফিসের ফাইল আর ল্যাপটপের চার্জারটা ড্রয়িং রুমের তাকে রয়ে গেছে। ওটা না হলে ওর চাকরি চলে যাবে। প্লিজ ভাবি, ওগুলো একটু দাও।"
​আমি জানতাম এটা একটা ফাঁ*দ। রাকেশ নিজে না এসে নিপাকে পাঠিয়েছে পরিস্থিতি বুঝতে। আমি ধীরপায়ে ভেতরে গিয়ে ওর ব্যাগটা নিয়ে এলাম, যা আমি আগেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। ড্রয়িং রুমের ড্রয়ারে পড়ে থাকা ফাইলগুলো বের করে নিপার হাতে দিলাম।
— "এই নাও। আর তোমার ভাইকে বলে দিও, এরপরে কোনো কিছুর দরকার হলে যেন তার উকিল আমার উকিলের সাথে কথা বলে। সরাসরি এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আসার চেষ্টা করলে পুলিশের কাছে খবর যাবে।"
​নিপা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই অহং*কারী চেহারাটা যেন চুইয়ে পড়ছে। সে বিড়বিড় করে বলল, "ভাবি, তুমি কি আসলেও এই পরিবারটা ভে*ঙে দেবে? একটা চায়ের কাপের জন্য এত জেদ?"
​আমি হাসলাম। খুব করুণ হাসি।
— "নিপা, ওটা শুধু একটা চায়ের কাপ ছিল না। ওটা ছিল তোমাদের দীর্ঘদিনের অবিচারের শেষ সীমা। আর জেদটা আমার একার নয়, এটা আমার বেঁচে থাকার তাগিদ। এবার যাও।"
​আমি দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিলাম। কিছুক্ষণ পর জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম নিপা নিচে রাখা একটা ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠল। সেখানে রাকেশ বসে ছিল। ফাইলটা হাতে পাওয়ার পর সে একবার ওপরের দিকে, আমার জানালার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো অনুশোচনা ছিল না, ছিল এক ধরণের জ্বলন্ত আক্রোশ। সে কি অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের ছক কষছে?
​রাত বাড়লে আমি আমার ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। আমি একজন একাউন্ট্যান্ট, সংখ্যা আর হিসেব নিয়ে আমার কারবার। কিন্তু আজ আমি জীবনের নতুন এক হিসেব মেলাতে বসেছি। আমার একাউন্টে যা জমা আছে, তা দিয়ে একা থাকা কঠিন নয়। কিন্তু যে সমাজ আমাকে 'পরিত্যক্তা' বলবে, তাদের সাথে লড়াই করার শক্তিটা আমাকে ভেতর থেকে জোগাতে হবে।
লেখকের পেইজের নাম The Story Haven
​হঠাৎ মনে পড়ল সেই মিক্সার-গ্রাইন্ডারটার কথা। ওটা বের করে আমি নিজের জন্য এক গ্লাস শরবত বানালাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ছোট ছোট জিনিসও আজ আমাকে অদ্ভুত আনন্দ দিচ্ছে। রাকেশ থাকাকালীন আমি নিজের পছন্দের খাবারটা পর্যন্ত ঠিকমতো খেতে পারতাম না।
​কিন্তু নিস্তব্ধতা ভাঙল রাত ১২টার দিকে। আমার ফোনে একটা মেসেজ এল। রাকেশ লিখেছে:
"মীরা, তুমি যে যু**দ্ধ শুরু করেছ, তার শেষটা খুব একটা সুখকর হবে না। কাল সকালে তোমার অফিসে কী হয়, সেদিকে খেয়াল রেখো। আমার মানহানি করার ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে।"
​আমার বুকটা ভয়ে হিম হয়ে গেল। রাকেশ আমাদের অফিসের বড় কর্তার পরিচিত। সে কি আমার চাকরিটা খেয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে? বিছানায় শুয়েও আমি আর ঘুমাতে পারলাম না। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, মুক্তি পাওয়া যতটা সহজ বলে ভেবেছিলাম, লড়াইটা তার চেয়েও বেশি কঠিন।
​তবুও, আমি হার মানার জন্য এতটা পথ আসিনি। কাল অফিসে যা-ই ঘটুক, আমি মাথা উঁচু করেই দাঁড়াব। কারণ যে মেয়েটা ফুটন্ত চায়ের জ্বালা সহ্য করতে পেরেছে, সে দুনিয়ার সব ষড়যন্ত্রও মোকাবিলা করতে পারবে।

চলবে...

Address

Dhaka
1236

Telephone

+8801641574622

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Emon Food Center posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Emon Food Center:

Share