31/03/2022
নাবালিকা অবস্থায় মোলেস্ট এর শিকার আমিও হয়েছি । বয়সটা তখন আমার কতো হবে এই আট কি নয় বছর। সম্ভবত তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আব্বু যেখানে চাকরি করতো ওইখানে স্টাফ কলোনি ছিলো। একসাইডে ফেমিলি বাসা ছিলো আর কিছুটা দূরত্বে ছিলো ব্যাচেলর বাসা। সেখানের অনেককে চাচ্চু বলে সম্মোধন করতাম। অনেকের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো আমার পরিবারের।
বৃহস্পতিবার ছিলো হাফ ক্লাস হবে। ক্লাস আর প্রাইভেট পড়া শেষ করে খেলার জন্য সময় পেতাম না আর এনার্জিও থাকতো না। তাই স্কুলে যাওয়ার আগে আম্মুকে বলেছিলাম আজ আসতে দেরি হবে।কারণ স্কুলের মাঠে সবাই খেলবো। আমার জন্য যেন সে চিন্তা না করে। ছুটি হয়েছে বারোটায়। খেলতে খেলতে কখন যে পৌনে তিনটা বেজে টেরই পেলাম না। এক বড় আপুর থেকে সময় জানার পর মাথায় হাত। আজ আম্মুর মাইর সব পিঠে পড়বে। বাসায় যেতে যেতে আরো আধা ঘণ্টা লাগবে। কোনোরকম ছুট লাগালাম বাসার উদ্দেশ্যে। বড় রাস্তা ধরে গেলে দেরী হবে তাই ব্যাচেলর বাসার গলি দিয়ে আসতে লাগলাম যেন তাড়াতাড়ি হয়।
সুনশান-নিস্তব্ধতা। আশেপাশে কেউ নাই। মাঝে মাঝে পাখির ডাক আসছে। স্টাফরা মনে হয় খেয়েদেয়ে আবার কাজে চলে গেছে। আর আমি হাঁটছি। হঠাৎ সামনে কেউ একজন এসে দাঁড়ায়। নিরিবিলি পরিবেশে হঠাৎ এসে দাঁড়ানোতে আমি ভয় পেয়ে যাই। মাথা তুলে দেখি একজন চাচ্চু। যে আব্বুর সাথে মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসতো। আমাকে দেখে ওনি হাসলো প্রতিত্তোরে আমিও হাসলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করলো কেন এতো দেরি হলো। সব বলার পর আমার হাত চেপে ধরে বলে আসো। তখনকার ছোট্ট আমি ওনার এইরকম কাজে কি রিয়েক্ট করবো সেটাই ভুলে গেছি। খানিক বাদে আবিস্কার করলাম ওনি আমার বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে চেপে ধরেছে।হয়তো সেখানে নরম মাংসপিণ্ডের অস্তিত্ব খুঁজছে। আমি তখন ওনার হাত থেকে বাঁচার জন্য মুচড়া মুচড়ি করছিলাম। প্রচুর ঘাবড়ে গিয়ে ছিলাম। রীতিমতো কাঁপতে লাগলাম। বুকে নরম মাংসপিন্ডের অস্তিত্ব না পেয়ে নিতম্বে চেপে ধরলো। মোলেস্ট, ধ'র্ষন এই ছোট্ট শব্দ গুলোর কঠিন অর্থ না জানলেও এতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে ওনার স্পর্শ গুলো খুব বাজে। ওনার উদ্দেশ্য খুব খুব খুব নোংরা। চিৎকার করে যে কাউকে ডাকবো সেটাই মাথায় ছিলো না। বয়সই কতো যে বুঝবো।
ওনার সেই খারাপ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য যখন ওনার রুমের তালা খুল ছিলো আমি সেই সুযোগে ওখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে আসি। আমাকে ধরতে চেয়েছিলো পারে নাই৷ এই ঘটনাগুলো আমার ছোট্ট মস্তিষ্কে খুব বাজে ভাবে প্রভাব ফেলে। মাঝরাতে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠতাম। মিশুক আমি কারো সাথে মিশতাম না। একা একা রুমে থাকতাম। আমার আব্বুর কাছেও যেতাম না। যেদিন ওনাকে আশপাশে দেখতাম সেদিন বেশি পাগলামি করতাম। ওনার শকুনির ন্যায় চাহনি আমার শরীরে কাটা দিয়ে উঠতো। আব্বুকে কাছে ঘেঁষতে দিতাম। এই ঘটনা কাউকে বলার কেন জানি সাহসই করতে পারতাম না। ভয় হতো খুব ভয়।তবে কিসের ভয় জানতাম না। বাবা মা কে কিছু না বললেও ওনারা বুঝে গিয়েছিলো আমার সাথে কিছু একটা হয়েছে। তাই বাসা পরিবর্তন করে আমাদের। সেই ঘটনার পর থেকে আমি একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলাম। আস্তে আস্তে সব পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করতে থাকি। আব্বু আম্মু আমাকে খুব সাহস দিতো।
এরই মাঝে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সময় কিভাবে চোখের পলকে চলে যায়। আমারও বিয়ে হয়েছে স্বামীর সংসার করছি। আমার স্বামী খুবই ভালো একজন মানুষ। একদিন সকালে সোফায় বসে নিউজ দেখতে দেখতে বাবুকে খাওয়াচ্ছিলাম। ব্রেকিং নিউজ দেখে চোখ আটকে গেলো। একটা দশ বছরের বাচ্চাকে কারা যেন ধ'র্ষন করে রাস্তায় ফেলে গেছে। মেয়েটা আইসিইউতে জীবন ম'রনের সাথে লড়াই করছে। মেয়ের বাবা রাজপথে নেমে এর বিচার চাইছে। লোকটাকে কোথায় যেন দেখেছি কিন্তু মনেই করতে পারছি না। নিউজ শুনে বাবুর বাবা পাশে বসলো।বসে বলে, কাল রাতে এই নিউজের কথা বলেছি। দেশটা জা'নোয়ারে ভরে গেছে। কিন্তু আমি ভাবছি লোকটা কে কোথায় দেখেছি?
সারাদিন ওই লোকের চেহারা টা চোখে ভেসেছে।কিন্তু মনেই করতে পারছিলাম না। রাতে মনে পড়ে এটাই সেই নরপিশাচ। যে বহু বছর আগে আমার সাথে,,,,,,
যার জন্য আমার শৈশবটা দূর্বিষহ কেটেছে। এই লোকের জন্য আমি কারো সাথে মিশতে পারতাম না। সেসব দিনের কথা হলে আমার এখনো দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার সাথে যা করেছে এর থেকেও খারাপ হয়েছে ওনার মেয়ের সাথে। ওনার পাপের শাস্তি নিষ্পাপ মেয়েটা পাচ্ছে। হিসাব করে দেখলাম গুনে গুনে ষোলো বছর পরে প্রকৃতি তার শোধ নিলো। চেয়েছিলাম নরপিশাচটা শাস্তি পাক কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ে তার সম্ভ্রম হারাক এটা চাইনি। এখন হয়তো বুঝতে পারবে একটা মেয়ে কাছে তার সম্ভ্রম কি। যদি ওনার জ্ঞান থেকে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই বুঝবে ওনার কর্মফল ওনার মেয়ে পাচ্ছে।
"আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না"
বাচ্চাদের দয়া করে কোনটা গুড টাচ আর কোনটা বেড টাচ সেটা শিখাবেন। আজকাল বাচ্চারা কোথাও সেইফ না। এমনকি নিজের পরিবারেও না। কোথাও না কোথাও সব মেয়েরা মোলেস্টের শিকার। এসব বাচ্চাদের ব্রেইনে খুব বাজে প্রভাব ফেলে।
#সমাপ্ত
#অণুগল্প
#রিভেঞ্জ_অফ_নেচার
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
ভুলত্রুটি মার্জনীয়। গল্প আর বাস্তব এক না দয়া করে মিলাতে যাবেন না।