27/03/2022
হাতের কাঁকন দিয়ে কেনা দাসী কাঁকনমালার কূটবুদ্ধিতে পরাজিত হলে রাণী কাঞ্চনমালার জীবনে নামে ঘোর অমানিশা৷ শেষে এক সুতাওয়ালার সাহায্যে চন্দ্রপুলী, মোহনবাঁশি, ক্ষীরমুরলী পিঠা বানিয়ে কাঞ্চনমালা প্রমাণ করেন যে তিনিই প্রকৃত রাণী!
আর দাসী কাঁকনমালা? আস্কে, চাস্কে আর ঘাস্কে পিঠা বানিয়ে বেচারি বেঘোরে নিজের পৈতৃক প্রাণটা খুইয়েছিলেন জল্লাদের হাতে৷
যে জনপদে পিঠা বানিয়ে নিজের পরিচয় এবং অধিকার ফিরে পাবার গল্প লোকমুখে ঘুরতে থাকে প্রজন্মান্তরে, সে জনপদের খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠা যে জনপ্রিয় আর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ, তা বলাই বাহুল্য৷
‘পিঠা' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক' শব্দ থেকে৷ আবার পিষ্টক এসেছে ‘পিষ্' ক্রিয়ামূলে তৈরি হওয়া শব্দ ‘পিষ্ট' থেকে৷ পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত, দলিত৷ হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে লিখেছেন, পিঠা হলো চাল গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ৷ বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশষ্য ধান৷ ধান থেকে চাল এবং সেই চালের গুঁড়ো পিঠা তৈরির মূল উপাদান৷
ভারত উপমহাদেশীয় সভ্যতার প্রেক্ষাপটে কখন থেকে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তার কোনো লিখিত বিবরণ নেই৷ প্রচলিত গল্প, প্রাচীন বইপত্র থেকে এর প্রাচীনত্ব নির্ণয় করা কিছুটা কঠিনই বটে৷ সংস্কৃত সাহিত্যে ‘পিষ্টক' শব্দটির উল্লেখ মেলে৷ সেই সূত্রে বলা চলে ভারতীয় উপমহাদেশে পিঠা খাবার প্রচলন অনেক প্রাচীন৷ বাংলাভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং ময়মনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা আখ্যানের সূত্র ধরে গত আনুমানিক পাঁচশ' বছর সময়কালে বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করা যায়৷ যেহেতু প্রাচীন বইপুস্তকে পিঠার কথা এসেছে, তাই ধরে নেওয়া যায়, পিঠা খাবার প্রচলন বাঙালি সমাজেও অনেক প্রাচীন৷ বিশাল উপমহাদেশে বসবাস করা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও পিঠা যে জনপ্রিয় খাবার সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷ তবে আমরা আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো রাজনৈতিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়া বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যে৷
বাংলাদেশে, এই একুশ শতকের শহুরে জীবনে সারা বছরই প্রায় পিঠা খাওয়া হয় দোকান থেকে কিনে৷ কিন্তু গ্রামীণ পরিসরে সারা বছর পিঠা খাওয়ার প্রচলন নেই৷ সেখানে শীতই হচ্ছে পিঠা বানানোর আদর্শ সময়৷ কৃষিসংস্কৃতির সাথে গ্রামীণ মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগই এর কারণ৷ অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান উঠে যাবার পর সেগুলো গোলাবন্দি করতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়৷ এই কর্মব্যস্ত সময়ে গ্রামীণ মানুষের ‘শখ' করার সময় থাকে না৷ নবান্ন করার পর ধীরেসুস্থে জাঁকিয়ে শীত পড়লে পৌষের সংক্রান্তিতে পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়৷ তারপর বসন্তের আগমন পর্যন্ত চলে হরেক পদের পিঠা খাওয়া৷ মূলত মাঘ আর ফাল্গুন এই দুই মাসই জমিয়ে পিঠা খাওয়া হয়৷ এর পরে আর পিঠার স্বাদ পাওয়া যায় না ঠিকমতো৷ নতুন ধান থেকে তৈরি চালে যে সুঘ্রাণ আর আর্দ্রতা থাকে, পিঠা বানানোর আটা তৈরিতে সেই চাল আদর্শ৷ ধান যত পুরাতন হতে থাকে ততই সে আর্দ্রতা হারাতে থাকে৷ ফলে সেই চালের আটায় তৈরি পিঠা আর সুস্বাদু থাকে না আগের মতো৷ হেমন্তে নতুন ধান উঠে গেলে নারীরা ঢেঁকিতে পিঠার জন্য চালের আটা বানাতো৷ ‘বানাতো' বলছি, কারণ, এখন আর ঢেঁকির প্রচলন নেই৷ এখন ‘কল' থেকে আটা তৈরি করে আনা হয়,
আর আমরা
আপনাকে নগরের ব্যাস্তময় জিবনে গ্রামের পিঠার মুখরোচক ষোলআনা স্বাদ আপনার দুয়ারে পৌঁছে দিতে সর্বদা প্রস্তুুত