26/08/2026
তাসবিহ ব্যবহার করা কি বিদ'আত? পর্ব ---২
জিকির করার সময় জিকিরের সংখ্যা গণনার জন্য মাধ্যম হিসেবে আঙুল, কঙ্কর (পাথর) খেজুরের আঁটি কিংবা প্রচলিত তাসবিহ ব্যবহার করার বিষয়ে ইমামগনের তিনটি মত পাওয়া যায়।
★১ম মত: বিদআত★
হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীর ১১ নং খন্ডের ২২৩ নং পৃষ্ঠায় আল্লামা তাকিউদ্দিন সুবকি রহ.-এর মতামত উল্লেখ করে বলেন:
«وقد أنكر ذلك جمعٌ من المتأخرين من الشافعية، وقال الشيخ تقي الدي السبكي في فتاويه: التسبيح بالمسبحة بدعة، ولم يكن ذلك في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم، وإنما حدث بعده.»
অনুবাদ:পরবর্তী যুগের কিছু শাফেয়ী আলেম এটিকে অস্বীকার করেছেন। শাইখ তাকিউদ্দিন সুবকি রহ. তাঁর ফাতাওয়ায় বলেছেন: তাসবিহের মাধ্যমে তাসবিহ গণনা করা বিদআত। এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে ছিল না; বরং তাঁর পর এটি প্রচলিত হয়েছে।”
প্রিয় পাঠক!! তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো,
প্রথমত: আল্লামা তাকিউদ্দিন সুবকি রহ. তাসবিহকে বিদআত বলার ক্ষেত্রে সালাফে সালেহীনের যুগের পর এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ির বিষয়টিকেই কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, শরিয়তের কোনো আমলের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করা হলে তা নিন্দনীয়.. এ কথা আমরাও অস্বীকার করি না। দ্বিতীয়ত: আল্লামা তাকিউদ্দিন সুবকি রহ. এই ফাতাওয়ার শেষ অংশে বলেছেন: «والأولى تركه» অর্থাৎ, “এটি পরিত্যাগ করাই উত্তম।”
তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, এখানে “বিদআত” শব্দ দ্বারা বিদআতে হাকিকী উদ্দেশ্য নয়; বরং অনুত্তম উদ্দেশ্য ।তাছাড়া ইবনু হাজার আসকালানী রহ. তাকিউদ্দিন সুবকি রহ.-এর এই মতামত উল্লেখ করার পর বলেন: «والجمهور على الجواز» আর জমহুর আলেমদের মত হলোএটি জায়েয।”
★২য় মত: মাকরুহ★
শাফেয়ী মাযহাবের অন্যতম মুহাক্কিক ইমাম নববী রহ. বলেন:
«قَالَ أَصْحَابُنَا: وَيُكْرَهُ السَّبْحُ بِالنَّوَى وَالْحَصَى وَالسُّبْحَةِ، وَلَمْ يَكُنْ ذَلِكَ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ»
অনুবাদ: “আমাদের ইমামগণ বলেছেন: খেজুরের আঁটি, কঙ্কর ও তাসবিহের মাধ্যমে তাসবিহ গণনা করা মাকরুহ। আর এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে ছিল না।”( আল আজকার পৃ: ২৩)
তাছাড়া ইমাম নববী রহ. আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব খণ্ড নং ৪ পৃষ্ঠা: ৫৯৫ বলেন:
«يُسْتَحَبُّ عَقْدُ التَّسْبِيحِ بِالْأَنَامِلِ، وَكُرِهَ بِالْحَصَى وَالسُّبْحَةِ»
অনুবাদ:“আঙুলের মাধ্যমে তাসবিহ গণনা করা মুস্তাহাব। আর কঙ্কর ও তাসবিহের মাধ্যমে গণনা করা মাকরুহ।”
অর্থাৎ ইমাম নববী রহ.-এর বক্তব্যের আলোচনায় মূল বিষয় হলো আঙুলের মাধ্যমে গণনা করা উত্তম, আর অন্য মাধ্যম গ্ৰহন করা তাঁর কাছে মাকরুহ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ, তাঁর দৃষ্টিতে আঙুলের সুন্নাহ পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
★৩য় মত:জায়েয; এবং এটিই প্রাধান্য প্রাপ্ত মত★
এ মত অনুযায়ী, জিকিরের জন্য আঙুল ছাড়াও কঙ্কর,খেজুরের আঁটি ও তাসবিহের মতো (وسائل ) মাধ্যম ব্যবহার করা জায়েয। তবে আঙুলের মাধ্যমে গণনা করা অধিক উত্তম এই মতের পক্ষে বিভিন্ন মাযহাবের অনেক মুহাক্কিক আলেমের বক্তব্য রয়েছে।
১.শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন:
«وَعَدُّ التَّسْبِيحِ بِالْأَصَابِعِ سُنَّةٌ، كَمَا عَقَدَ النَّبِيُّ ﷺ بِالْأَصَابِعِ، وَأَمَّا عَدُّهُ بِالنَّوَى وَالْحَصَى وَنَحْوِ ذَلِكَ فَحَسَنٌ، وَكَانَ مِنْ الصَّحَابَةِ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ»
অনুবাদ: “আঙুলের মাধ্যমে তাসবিহ গণনা করা সুন্নত, যেমন নবী ﷺ আঙুলের মাধ্যমে গণনা করেছেন। আর খেজুরের আঁটি, কঙ্কর ও এ ধরনের জিনিসের মাধ্যমে গণনা করাও উত্তম। সাহাবাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনটি করতেন।” (আল-ফাতাওয়া আল কুবরা ৫/২৪৯)
লক্ষণীয় বিষয় হলো:এখানে ইবনু তাইমিয়্যাহ রহ. একদিকে আঙুলে গণনাকে সুন্নত বলেছেন, অন্যদিকে খেজুরের আঁটি, কঙ্কর ও অনুরূপ মাধ্যমেও গণনাকে ভালো বলেছেন।
২.শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনু আহমদ নাসাফী হানাফী রহ. বলেন العقد الثمين في إثبات التسبيح باليمين ২৩ নং পৃষ্ঠায় এই তৃতীয় মতকে বিশুদ্ধ মত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন
«الثَّالِثُ: الْجَوَازُ، وَهُوَ الصَّحِيحُ، لِأَنَّهُ أَسْكَنُ لِلْقُلُوبِ، وَأَجْلَبُ لِلنَّشَاطِ»
অনুবাদ:তৃতীয় মত হলো জায়েয। আর এটিই বিশুদ্ধ মত। কারণ, এটি অন্তরকে অধিক প্রশান্ত করে এবং ইবাদতের প্রতি অধিক উদ্যম সৃষ্টি করে।”
এখানে নাসাফী রহ. স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: الْجَوَازُ، وَهُوَ الصَّحِيحُ
জায়েয আর এটিই বিশুদ্ধ মত।”
৩.আল্লামা আব্দুল হাই লাখনবী রহ. مجموعة رسائل اللخنوي খণ্ড:১, পৃষ্ঠা: ১৪৯–১৫১তাসবিহ ব্যবহারের ব্যাপারে তৃতীয় মতকে প্রাধান্য দিয়ে বলেন: «فَالْحَقُّ أَنَّهُ جَائِزٌ بِلَا كَرَاهَةٍ، بَلْ هُوَ مُسْتَحَبٌّ عِنْدَ الْحَاجَةِ» অর্থাৎ:“সঠিক কথা হলো এটি কোনো প্রকার মাকরুহ ছাড়াই জায়েয। বরং প্রয়োজনের সময় এটি মুস্তাহাব। আল্লামা আব্দুল হাইলাখনবী রহ. এর বক্তব্য অনুযায়ী শুধু জায়েযই নয়; বরং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাসবিহ ব্যবহার করা মুস্তাহাবও হতে পারে।
৪.শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন রহ. لقاء الباب المفتوح খণ্ড:৩নং পৃষ্ঠা: ৩০ এ বলেন:
«التسبيح بالمسبحة لا بأس به، ولكن التسبيح بالأصابع أفضل»
অনুবাদ: “তাসবিহের মাধ্যমে তাসবিহ পড়তে কোনো সমস্যা নেই। তবে আঙুলের মাধ্যমে তাসবিহ পড়া অধিক উত্তম। এখানে তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট তিনি বলেছেন«لا بأس به» যা জায়েয হওয়ারই প্রমান বহন করে , একই সঙ্গে তিনি আরো বলেছেন «ولكن التسبيح بالأصابع أفضل» তবে আঙুলের মাধ্যমে গণনা করা অধিক উত্তম।”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝে রাখা দরকার সেটা হল কেউ বলেননি যে প্রচলিত দানার তাসবিহ ব্যবহার করাই সুন্নত।বরং তৃতীয় মতের ইমামগন মূলত জায়েয বলেছেন।অর্থাৎ, তাসবিহের দানা ব্যবহার করা সুন্নত এ কথা বলা হচ্ছে না; বরং তা বৈধ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।একই সঙ্গে আরো বলা হচ্ছে যে “আঙুলের মাধ্যমে জিকির গণনা করা অধিক উত্তম।”
জিকির গণনার ক্ষেত্রে আঙুল, কঙ্কর ও খেজুরের আঁটি ব্যবহার করা হাদিসসমূহ দ্বরা ও প্রমানিত
১. রাসুলুল্লাহ ﷺ আঙুলে তাসবিহ গণনা করতেন:
সুনানে আবু দাউদে এসেছে
«حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ بْنِ مَيْسَرَةَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ قُدَامَةَ، فِي آخَرِينَ، قَالُوا: حَدَّثَنَا عُثَامٌ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَعْقِدُ التَّسْبِيحَ. قَالَ ابْنُ قُدَامَةَ: بِيَمِينِهِ.»
অর্থ:আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে তাসবিহ গণনা করতে দেখেছি।” ইবনু কুদামাহর বর্ণনায় রয়েছে“তাঁর ডান হাত দিয়ে।”
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫০২
জামে‘ তিরমিযী, হাদিস: ৩৪১১
এই হাদিসের হুকুম সম্পর্কে
১.ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ»
২.ইমাম নববী রহ. বলেছেন «إِسْنَادُهُ حَسَنٌ»“এর সনদ হাসান।”
( আল-আযকার, ১/৪৫)
৩.হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. বলেছেন«رِجَالُهُ ثِقَاتٌ» “এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।”
(নাতায়িজুল আফকার ১/২৩৮)
উল্লেখিত বর্ননা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আঙুলের মাধ্যমে জিকির গণনা করা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হল।
২. ইউসাইরা রা.-এর হাদিসে আঙুলের ডগায় জিকির গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
সুনানে আবু দাউদে এসেছে
«حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ دَاوُدَ، عَنْ هَانِئِ بْنِ عُثْمَانَ، عَنْ حُمَيْضَةَ بِنْتِ يَاسِرٍ، عَنْ يُسَيْرَةَ، أَخْبَرَتْهَا، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ أَمَرَهُنَّ أَنْ يُرَاعِينَ بِالتَّكْبِيرِ، وَالتَّقْدِيسِ، وَالتَّهْلِيلِ، وَأَنْ يَعْقِدْنَ بِالْأَنَامِلِ، فَإِنَّهُنَّ مَسْئُولَاتٌ، مُسْتَنْطَقَاتٌ.»
অর্থ:ইউসাইরা রা. বর্ণনা করেন, নবী ﷺ তাঁদের তাকবির, তাকদিস ও তাহলিল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আঙুলের ডগার সাহায্যে তা গণনা করতে বলেছেন। কারণ, এসব আঙুল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে এবং এগুলোকে কথা বলানো হবে।সুনানে তিরমিযীর বর্ণনায় এসেছে
«عَلَيْكُنَّ بِالتَّسْبِيحِ وَالتَّهْلِيلِ وَالتَّقْدِيسِ، وَاعْقِدْنَ بِالْأَنَامِلِ، فَإِنَّهُنَّ مَسْئُولَاتٌ مُسْتَنْطَقَاتٌ، وَلَا تَغْفُلْنَ فَتَنْسَيْنَ الرَّحْمَةَ.»
অর্থ: “তোমরা তাসবিহ, তাহলিল ও তাকদিসকে অবলম্বন করো এবং আঙুলের ডগার সাহায্যে গণনা করো। কারণ এগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে এবং এগুলোকে কথা বলানো হবে। আর তোমরা গাফেল হয়ো না; তাহলে রহমত ভুলে যাবে।”
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫০১
জামে‘ তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৮৩
সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস: ৮৪২
এই হাদিস সম্পর্কে
১. ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন «هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ» “এটি গরীব হাদিস।”
২. হাফেজ ইরাকী রহ. বলেছেন «إِسْنَادُهُ جَيِّدٌ» “এর সনদ জাইয়িদ।”
৩. শাইখ শু‘আইব আরনাউত রহ. বলেছেন «إِسْنَادُهُ حَسَنٌ»এর সনদ হাসান।” (تخريج المسند, হাদিস: ২৭০৩৫)
অতএব, আঙুলের ডগার মাধ্যমে জিকির গণনা করা শুধু সাহাবির আমল নয়; বরং তা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ দ্বারাও প্রমাণিত।
৩. কঙ্কর বা খেজুরের আঁটি দিয়ে তাসবিহ গণনা :
সুনানে আবু দাউদে সা‘দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা.-এর হাদিস এসেছে।
«حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ صَالِحٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ وَهْبٍ، أَخْبَرَنِي عَمْرٌو، أَنَّ سَعِيدَ بْنَ أَبِي هِلَالٍ حَدَّثَهُ، عَنْ خُزَيْمَةَ، عَنْ عَائِشَةَ بِنْتِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهَا، أَنَّهُ دَخَلَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ عَلَى امْرَأَةٍ وَبَيْنَ يَدَيْهَا نَوًى أَوْ حَصًى تُسَبِّحُ بِهِ، فَقَالَ: أُخْبِرُكِ بِمَا هُوَ أَيْسَرُ عَلَيْكِ مِنْ هَذَا أَوْ أَفْضَلُ، فَقَالَ: سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاءِ، وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ فِي الْأَرْضِ، وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا خَلَقَ بَيْنَ ذَلِكَ، وَسُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ مَا هُوَ خَالِقٌ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ مِثْلَ ذَلِكَ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ مِثْلَ ذَلِكَ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ مِثْلَ ذَلِكَ.»
অর্থ: সা‘দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে এক মহিলার কাছে প্রবেশ করেন। তার সামনে খেজুরের আঁটি অথবা কঙ্কর ছিল, যার মাধ্যমে সে তাসবিহ পড়ছিল। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আমি কি তোমাকে এর চেয়ে সহজ অথবা উত্তম একটি পদ্ধতি বলে দেব?”এরপর তিনি তাকে এই জিকির শিক্ষা দেন “আকাশে আল্লাহ যত কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার সংখ্যা পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’; পৃথিবীতে আল্লাহ যত কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার সংখ্যা পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’; এ দুয়ের মাঝে তিনি যত কিছু সৃষ্টি করেছেন, তার সংখ্যা পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’; এবং তিনি যত কিছু সৃষ্টি করবেন, তার সংখ্যা পরিমাণ ‘সুবহানাল্লাহ’। আর অনুরূপ ‘আল্লাহু আকবার’, অনুরূপ ‘আলহামদুলিল্লাহ’, অনুরূপ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং অনুরূপ ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।”
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫০০
জামে‘ তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৬৮
সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস: ৮৩৭
এই হাদিসের সনদ সম্পর্কে
১. হাকিম নিশাপুরী রহ. বলেছেন «هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ» “এটি সহিহ সনদের হাদিস।”
২. ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী রহ. বলেছেন «صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ مُسْلِمٍ» “মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহিহ।”
৩. শাইখ শু‘আইব আল আরনাউত রহ. বলেছেন «حَسَنٌ لِغَيْرِهِ»
অতএব, কঙ্কর বা খেজুরের আঁটি দ্বার তাসবিহ পাঠ করার বিষয়টি ও গ্রহণযোগ্য হাদিস দ্বারা সমর্থিত।কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ ওই নারীকে কঙ্কর বা খেজুরের আঁটি দিয়ে জিকির করার কারণে নিষেধ করেননি; বরং তাঁকে আরও উত্তম একটি জিকির শিক্ষা দিয়েছেন।
মোল্লা আলী আল-কারি (রহ.) তাঁর مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح-এ লিখেছেন:
«قال ابن حجر: والروايات في التسبيح بالنوى والحصى كثيرة عن الصحابة، وبعض أمهات المؤمنين، بل رآها عليه السلام، وأقر عليها، قيل: وعقد التسبيح بالأنامل أفضل من المسبحة، وقيل: إن أمن الغلط فهو أولى، وإلا فهي أولى.»
অর্থ:“ইবনু হাজার বলেছেন: খেজুরের আঁটি ও কঙ্কর দ্বারা তাসবিহ গণনার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম এবং উম্মাহাতুল মুমিনীন থেকে বহু বর্ণনা রয়েছে। বরং নবী ﷺ তা দেখেছেন এবং তা অনুমোদন করেছেন। বলা হয়েছে, আঙুলের মাধ্যমে তাসবিহ গণনা তসবিহের দানা দ্বারা গণনার চেয়ে উত্তম। আর বলা হয়েছে, ভুল হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে আঙুলের মাধ্যমে গণনাই উত্তম; অন্যথায় তসবিহ দ্বারা গণনা উত্তম।”
(মিরকাতুল মাফাতিহ৪/৫৪)
হাশিয়াতুত তহতাবী ‘আলা মারাকিল ফালাহতে ও ইবনু হাজার রহ উদ্ধৃতিতে এই বক্তব্যটি উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে:
«قال ابن حجر: والروايات بالتسبيح بالنوى والحصى كثيرة عن الصحابة وبعض أمهات المؤمنين بل رآها صلى الله عليه وسلم وأقرها عليه..»
(হাশিয়াতুত তহতাবী ‘আলা মারাকিল ফালাহ১/৩৭২)
৪. সাফিয়্যা রা.-এর সামনে ৪,০০০ খেজুরের আঁটি ছিল
জামে‘ তিরমিযীতে এসেছে
«حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ بْنُ عَبْدِ الْوَارِثِ، قَالَ: حَدَّثَنَا هَاشِمٌ، وَهُوَ ابْنُ سَعِيدٍ الْكُوفِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنِي كِنَانَةُ، مَوْلَى صَفِيَّةَ، قَالَ: سَمِعْتُ صَفِيَّةَ تَقُولُ: دَخَلَ عَلَيَّ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَبَيْنَ يَدَيَّ أَرْبَعَةُ آلَافِ نَوَاةٍ أُسَبِّحُ بِهَا، قَالَ: لَقَدْ سَبَّحْتُ بِهَذِهِ، أَلَا أُعَلِّمُكِ بِأَكْثَرَ مِمَّا سَبَّحْتِ؟ فَقُلْتُ: بَلَى، عَلِّمْنِي، فَقَالَ: قُولِي: سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ خَلْقِهِ.»
অর্থ: সাফিয়্যা রা. বলেন:“রাসুলুল্লাহ ﷺ আমার কাছে প্রবেশ করলেন। আমার সামনে চার হাজার খেজুরের আঁটি ছিল, যার মাধ্যমে আমি তাসবিহ পড়ছিলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি এগুলোর মাধ্যমে তাসবিহ পড়েছ। আমি কি তোমাকে এর চেয়েও বেশি সওয়াবের একটি পদ্ধতি শিক্ষা দেব?’আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমাকে শিক্ষা দিন।’তিনি বললেন, ‘বলবে: «سُبْحَانَ اللَّهِ عَدَدَ خَلْقِهِ»
জামে‘ তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৫৪
মুসনাদ আবু ইয়া‘লা, হাদিস: ৭১১৮
আল-মু‘জামুল আওসাত, তাবারানী, ২৪/৭৪, হাদিস: ১৯৫
আল-মুস্তাদরাক, হাকিম, হাদিস: ২০৩৪
এই হাদিসের ব্যাপারে ইমামদের বক্তব্য পরস্পর ভিন্ন।
১. ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন «هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ، لَا نَعْرِفُهُ مِنْ حَدِيثِ صَفِيَّةَ إِلَّا مِنْ هَذَا الْوَجْهِ مِنْ حَدِيثِ هَاشِمِ بْنِ سَعِيدٍ الْكُوفِيِّ، وَلَيْسَ إِسْنَادُهُ بِمَعْرُوفٍ.»
অর্থ:এটি একটি গরীব হাদিস। হাশিম ইবনু সা‘ঈদ আল-কূফীর এই সূত্র ছাড়া সাফিয়্যা রা.-এর হাদিস হিসেবে আমরা এটিকে অন্য কোনো সূত্রে জানি না এবং এর সনদ পরিচিত নয়।”
২. ইমাম হাকেম নিশাপুরী রহ. বলেছেন «هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ» “এটি সহিহ সনদের হাদিস।”( আল-মুস্তাদরাক, হাদিস: ২০৩৪)
৩. হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. নাতায়িজুল আফকার ২/৭৬ পৃষ্ঠায় এটিকে «حَسَنٌ» বলেছেন
সাফিয়্যা রা.-এর এই হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম তিরমিযী রহ. সনদকে «ليس إسناده بمعروف» বলেছেন; অপরদিকে ইমাম হাকিম রহ. «صحيح الإسناد» বলেছেন এবং হাফেজ ইবনু হাজার রহ. এটিকে «حسن» বলেছেন। ফাজায়েলের ক্ষেত্রে যেহেতু জয়ীফ হাদিসও প্রমাণযোগ্য হয় সেহেতু হাদিসটিকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলা ঠিক হবে।
উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট:
প্রথমত আঙুলের মাধ্যমে তাসবিহ পড়া রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আমল ও নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত।
দ্বিতীয়ত: তাসবীহ পাঠ করার ক্ষেত্রে কঙ্কর ও খেজুরের আঁটি ব্যবহারের বর্ণনাও হাদিসের কিতাবে রয়েছে।
তৃতীয়ত:এসব বর্ণনার মধ্যে কিছু হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একাধিক মুহাদ্দিস সেগুলোকে حسن، صحيح الإسناد، حسن لغيره ইত্যাদি পরিভাষায় গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
সুতরাং শুধু এ যুক্তিতে যে, “রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে বর্তমান প্রচলিত তসবিহের দানা ছিল না” সুতরাং প্রচলিত পদ্ধতিতে তাসবীহ বর্ণনা করা বিদআত হবে, কারণ জিকিরের সংখ্যা গণনার মূল বিষয়টি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এবং গণনার মাধ্যম হিসেবে আঙুলের পাশাপাশি কঙ্কর ও খেজুরের আঁটির ব্যবহার সম্পর্কেও বর্ণনা রয়েছে।
চলবে..................