19/06/2026
জামায়াত যে আসনগুলোতে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে, সেসব আসন ভবিষ্যতে দলটির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। উদাহরণ চাইলে বহু উদাহরণ পেশ করা যাবে।
একজন জনপ্রতিনিধির জনবান্ধব হওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হলো—সাধারণ মানুষ কি অনুভব করছে যে তাদের এলাকায় জামায়াতের একজন এমপি আছেন? মানুষ কি তাঁর মাধ্যমে কোনো উপকার পাচ্ছে? এলাকার আপদ-বিপদে তাঁকে কি পাওয়া যাচ্ছে?
জামায়াতের এমপিরা হয়তো দুর্নীতি করবেন না, মোটামুটি উন্নয়নমূলক কাজও করবেন। কিন্তু মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে তাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সংকট, দ্বন্দ্ব ও সমস্যার সমাধান হচ্ছে কি না—সেটি। শুধু কল্যাণমূলক (ওয়েলফেয়ার) কার্যক্রম দিয়ে মানুষের সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব নয়; রাজনীতিতেও কার্যকর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব প্রয়োজন।
একজন নাগরিকের জীবনে প্রতিনিয়ত যে প্রয়োজনগুলো দেখা দেয়, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রই বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে, যদিও আসনটি জামায়াতের। ফলে মানুষ আরও হতাশ হচ্ছে। ভোট দিয়েছে জামায়াতকে, কিন্তু সমস্যার সমাধানের জন্য ঘুরতে হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে।
এই ক্ষেত্রে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
কোনো ব্যক্তি জুলুমের শিকার হয়ে বা রাজনৈতিক সংকটে পড়ে কোনো জামায়াত নেতার কাছে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে কল্যাণমূলক কোনো বিষয়ে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—মানুষ অনেক সময় ঘুষ দিয়েও হোক, নিজের সমস্যার সমাধান চায়। শুধু ধৈর্যের উপদেশ দিলে হবে না।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল নেতাও একজন কনস্টেবলকে অতিরিক্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে সম্বোধন করছেন। যদিও সবাই এমন নন, তবে এ ধরনের প্রবণতা কম নয়। এটিই বাস্তব পরিস্থিতি।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ক্ষেত্রে একজন এমপি থাকলেও জেলায় আরও অনেক প্রভাবশালী নেতা থাকেন, যারা কার্যত এমপির মতোই প্রভাব বিস্তার করেন। তাদের অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতারাও উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ধারণ করেন। তাদের সাংগঠনিক বিস্তার পুরো জেলায় দৃশ্যমান।
এছাড়া তাদের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের আত্মবিশ্বাস, উপস্থিতি ও নেতৃত্বের যে প্রকাশ দেখা যায়, তা অনেক সময় জামায়াতের জেলা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও অনুপস্থিত। এমনকি জেলার অনেক দায়িত্বশীল নেতাকে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো চিনেও না।
মূল সমস্যা এখানেই। জামায়াতের নেতাকর্মীরা মানুষের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় শত শত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা গিয়ে একমাত্র এমপির ওপরই পড়ে। অথচ এ দেশের মানুষ মনে করে সবকিছুর দায়িত্ব একজন এমপির। এর ফলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে।
আমি জামায়াতের নেতাদের বলছি না যে আপনারাও অন্যদের মতো চাঁদাবাজি করবেন, টাকা খেয়ে বা ভাগ দিয়ে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।
বরং আপনাদের দায়িত্ব ছিল চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পুলিশ, অফিস-আদালতে ঘুষ বাণিজ্য দমনের সক্ষমতা অর্জন করা। সেই সক্ষমতা তৈরি করুন।
খোঁজ নিয়ে দেখুন, অনেক জায়গায় জামায়াতের আসনগুলোতেও পুলিশ আগের চেয়ে বেশি সাহসের সঙ্গে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
আপনারা দখল করবেন না—সেটি ভালো কথা। কিন্তু অন্তত দখলমুক্ত রাখার সক্ষমতা দেখান। এটাই আপনাদের রাজনৈতিক রূপরেখা হওয়া উচিত। নতুবা এই সংকটের সমাধান হবে না।
দলের সমালোচনা করা মানেই দলের বিরোধিতা করা নয়। বাস্তবতাকে স্বীকার করুন, বাস্তবতায় আসুন। তাহলেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত হবে এবং সমাধানের পথ তৈরি হবে।