17/09/2026
তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয় — চড়ুই পাখির উদাহরণ দিয়ে নবীজি (সা.) আসল অর্থটা বুঝিয়েছেন
তাওয়াক্কুল শব্দটা আমরা প্রায়ই ভুল বুঝি। কেউ মনে করেন তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকা — আল্লাহ যা দেওয়ার দেবেন। আবার কেউ এতটাই আসবাবের পেছনে ছোটেন যে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা ভুলেই যান। এই দুই প্রান্তের মাঝখানে আসল তাওয়াক্কুলটা কোথায়? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা ছোট্ট পাখির উদাহরণ দিয়ে এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিয়েছেন।
হাদিসটা শুনুন —
لَوْ أَنَّكُمْ تَتَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ كَمَا يَرْزُقُ الطَّيْرَ، تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا
উচ্চারণ: লাও আন্নাকুম তাতাওয়াক্কালুনা আলাল্লাহি হাক্কা তাওয়াক্কুলিহি লারাযাকাকুম কামা ইয়ারযুকুত তাইর, তাগদু খিমাসাঁও ওয়া তারুহু বিতানা।
অর্থ: তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন যেভাবে পাখিদের রিযিক দেন — তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে। (জামি আত-তিরমিজি, হাদিস ২৩৪৪, হাসান সহিহ)
এই হাদিসের একটা শব্দে পুরো রহস্য লুকিয়ে আছে — "তাগদু," তারা সকালে বের হয়। লক্ষ করুন, পাখি কিন্তু বাসায় বসে থাকে না। খাবার নিজে উড়ে এসে বাসায় ঢোকে না। পাখি প্রতিদিন সকালে বের হয়, খাবার খোঁজে, পরিশ্রম করে — তারপর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফেরে। অর্থাৎ তাওয়াক্কুলের সাথে চেষ্টা জড়িত, চেষ্টা ছাড়া তাওয়াক্কুল হয় না।
শায়খ উসামা আল-শুরাফা রিযিকের ম্যানুয়ালের তৃতীয় অধ্যায় "সম্পদ, আসবাব ও তাওয়াক্কুল"-এ এই ভারসাম্যটাকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, পাখি দুইটা কাজ একসাথে করে। প্রথমত সে বের হয় — অর্থাৎ আসবাব গ্রহণ করে, চেষ্টা করে। দ্বিতীয়ত সে দুশ্চিন্তা করে না — খালি পেটে বের হওয়ার সময় সে জানে না আজ কী পাবে, তবু সে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বের হয়। এই দুইটার সমন্বয়ই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। তাওয়াক্কুল আসবাবের ওপর ভরসা করা নয়, আবার আসবাব ত্যাগ করাও নয়। তাওয়াক্কুল হলো আসবাব ব্যবহার করা, কিন্তু অন্তরে ভরসা রাখা আসবাবের স্রষ্টার ওপর। পাখি ডানা ব্যবহার করে, কিন্তু ডানার ওপর ভরসা করে না — ভরসা করে সেই আল্লাহর ওপর, যিনি প্রতিদিন তার রিযিকের ব্যবস্থা করেন। ঠিক তেমনি একজন ব্যবসায়ী পরিশ্রম করবেন, কৌশল খাটাবেন, কিন্তু অন্তরে জানবেন রিযিকের ফয়সালা আল্লাহর হাতে।
এই বোঝাপড়াটা আমাদের দুশ্চিন্তার শিকড় কেটে দেয়। আমরা দুশ্চিন্তা করি কারণ আমরা ভাবি ফলাফলটা আমাদের হাতে। কিন্তু পাখির মডেলটা শেখায় — কাজটা আমার, ফলাফলটা আল্লাহর। এই বিভাজনটা মেনে নিলে কাজে পুরো শক্তি দেওয়া যায়, অথচ ফলাফল নিয়ে অস্থিরতা থাকে না।
আজকের জীবনে এই শিক্ষা কাজে লাগানোর একটা সহজ অনুশীলন দিই। আগামীকাল সকালে কাজে বের হওয়ার সময় পাখির কথাটা মনে করুন। মনে মনে বলুন — "আমি চেষ্টা করছি, পাখির মতো বের হচ্ছি, কিন্তু ফলাফলটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম।" তারপর কাজটা পুরো মনোযোগ দিয়ে করুন, আর ফলাফল নিয়ে দুশ্চিন্তা এলে বারবার নিজেকে মনে করান — আমার কাজ শুধু বের হওয়া, পেট ভরানোর দায়িত্ব সেই রাযযাকের।
তাওয়াক্কুলের এই সঠিক অর্থ, আসবাব ও ভরসার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য, আর কীভাবে দুশ্চিন্তামুক্ত থেকেও পূর্ণ পরিশ্রম করা যায় !