13/08/2026
চুইঝাল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের, বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোর এলাকার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী মসলা। এটি মূলত মাংসের স্বাদে ভিন্নতা এবং তীব্র ঝাল আনার জন্য ব্যবহৃত হয়। যদিও এটি বর্তমানে ওই অঞ্চলের খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এর ইতিহাস বেশ কৌতুহল উদ্দীপক।
সংক্ষেপে চুইঝালের ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রাচীন মূল: চুইঝাল (বৈজ্ঞানিক নাম: Piper chaba) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্থানীয় প্রজাতি। এটি ভারত, বাংলাদেশ ছাড়াও মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং শ্রীলঙ্কায় জন্মে। এটি মূলত একটি সপুষ্পক লতা জাতীয় গাছ, যা অন্য বড় গাছকে আঁকড়ে ধরে বাড়ে। পান এবং চুইঝাল একই পরিবারের উদ্ভিদ।
মরিচ-পূর্ব যুগে ঝালের উৎস: ভারতীয় উপমহাদেশে ১৫শ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের হাত ধরে মরিচ আসার আগে, খাবারের ঝাল ও ঝাঁঝালো স্বাদ আনার জন্য মূলত গোলমরিচ, পিপুল এবং এই চুইঝাল ব্যবহার করা হতো। সেই মরিচ-পূর্ব যুগ থেকেই চুইঝাল বাংলার রন্ধনশৈলীতে তার স্থান করে নিয়েছিল। মরিচ আসার পর দেশের অন্যান্য অংশে চুইঝালের ব্যবহার কমে গেলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এর অনন্য স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে এটি ধরে রাখে।
আঞ্চলিক জনপ্রিয়তা: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চুইঝালের ব্যবহার ব্যাপক হওয়ার মূল কারণ সম্ভবত এর সহজলভ্যতা এবং ওই অঞ্চলের মানুষের ভোজনরসিকতা। ওই অঞ্চলে উঁচু জায়গায় চুইগাছ ভালো জন্মে। স্থানীয়রা বংশপরম্পরায় মাংস এবং কিছু বিশেষ মাছ রান্নায় চুইঝালের কাণ্ড, শিকড় বা লতা কেটে ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে গরুর মাংস, খাসির মাংস বা হাঁসের মাংসে চুইঝালের টুকরো দিয়ে ধিমে আঁচে রান্না করা এই অঞ্চলের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ।
সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: বর্তমানে চুইঝাল শুধু একটি মসলা নয়, এটি খুলনাসহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর আঞ্চলিক পরিচয়ের একটি প্রতীক। খুলনার চুইঝাল গরুর মাংস দেশজুড়ে ভোজনরসিকদের কাছে অত্যন্ত কদরের। এটি একটি অর্থকরী ফসল হিসেবেও ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
চুইঝাল কেবল খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, এর অনেক ঔষধি গুণও রয়েছে, যা প্রাচীন চিকিৎসা শাস্ত্রে এবং স্থানীয় লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।