12/07/2020
( মনোযোগ দিয়ে পড়বেন.
আশা করছি ভালো লাগবে।)
কবিতা: চিঠি এসেছে।
লেখিকা: স্নিগ্ধ ঐশী
চিঠি এসেছে আজ।
আমার যখন আঠারো বছর বয়স তখন আমি তার প্রেমে পরেছিলাম।
এখন আমি ষাট এ পা দিয়েছি।
ভারি গ্লাসের চশমাটা শাড়ির আছলে মুছে নিয়ে চিঠিটা ধিরে ধিরে খুলছি,
এ যুগে এত বড় চিঠি, অনেক বছর পর,বুকের ভেতর কেমন শুন্য লাগছে, ধকধক করছে।
টেবিলে রাখা এক গ্লাস পানি খেয়ে, চিঠি পরতে শুরু করলাম।
প্রিয়তমা,
কেমন আছো?
প্রিয়তমা শব্দটা পড়েই কেমন থমকে গেলাম,
যাই হোক আবার পড়তে শুরু করলাম।
জানোতো অনেক খুজে তোমার ঠিকানা পেলাম।
তোমাকে ফোনে কল দিতে পারতাম,সাহস হয়নি।
আজ তোমাকে যা বলবো তা হয়তো ফোনে বলতে পারতামনা। তাই তোমাকে চিঠি লেখা।
তোমার মনে আছে? তুমি যখন ভারসিটির লম্বা ছুটিতে বাড়িতে যেতে, আমাকে খুব করে বলতে একটা চিঠি লেখো কেমন। আমার খুব ইচ্ছে চিঠিতে তুমি তোমার মনের কথাগুলো আমাকে লেখো।
আমি হেসেই উরিয়ে দিতাম।
বলতাম, এ যুগে আবার কিসের চিঠি,যাওতো তুমি।
আর তুমি মন খারাপ করে চলে যেতে,
বাস ছেরে দেয়ার পর ও যতদুর পর্যন্ত আমাকে দেখা যেত তুমি তাকিয়ে থাকতে।
আমার তখন ঔ সব কেমন বিরক্ত লাগতো।
তুমি চলে যাওয়ার পর আমার আর এক প্রেমিকা উর্মি, ওর কাছে চলে যেতাম।
তুমি ঢাকা ছারলেই আমার ভালো লাগতো, আমি উর্মিকে বাসায় এনে অনেক সময় পার করতাম।
তোমাকে আমার মনেই পরতোনা।
তোমার ফোন কল গুলো ইগনর করতাম।
দেখতে দেখতে দুবছর এভাবেই চলে গেলো,
একদিন তুমি সব জানতে পারলে,
ওর হাতে আমাকে তুলে দিয়ে তুমি চলে গেলে।
আমিও আর তোমার খোজ রাখিনি।
পড়ে একদিন শুনলাম তুমি বিয়ে করে সুখেই আছো।
আমিও বিয়ে করেছি, উর্মি আমাকে বিয়ে করেনি,
এক বিশাল শিল্পপতিকে বিয়ে করেছে সে।
যাবার সময়,আমাকে ভিখারি বলে চলে গেছে।
হ্যাঁ ঠিক বলেছে হয়তো, মেস ভারা নেই বলে ভিখারির মতো তোমার থেকে যে টাকা নিতাম,তা দিয়ে আমি উর্মিকে ভালো রেস্টুরেন্ট এ নিয়ে খাওয়াতাম।
অথচ, তোমার সাথে দেখা করতে যাবার সময়, দশ টাকা যাতায়াত ভারা নিয়ে বের হতাম।
বাকিটা তুমি দেখবে আমি যানতাম।
রাতের পর রাত আমি তোমাকে কাদিঁয়েই গেছি।
তুমি কাঁদতে আর আমি উর্মির সাথে ব্যাস্ত থাকতাম।
কাঁদতে কাদঁতে তুমি ঘুমিয়ে যেতে ভোর রাতে।
সকালে আর ক্লাসে আসতে পারতেনা।
তবুও কি করে ফাস্ট ক্লাস পেতে।
আর আমি দুটো বিষয় ফেল।
শেষ দিন তোমাকে যখন বাম গালে চড় মেরে বলেছিলাম, তোমাকে আমার আর চাইনা।
তখন তুমি চুপ করেই চলে গেছো,
তবে তোমার ঔ চোখ দুটো মনে হয় খুব অভিষাপ দিয়েছিলো।
তাই হয়তো বিয়ের পাচঁ বছর পর ও সন্তানের বাবা হতে পারিনি। আজ আমার আঠারো বছরের একটা মেয়ে আছে, দু'মাস আগে একটা ছেলের কাছে ধোকা খেয়ে মেয়েটা পাগল প্রায়।
আমার মেয়ের সন্তানকে সেই ছেলেটি অস্বীকার করেছে। এখন মেয়েটাকে আমার ঘরের ভেতর দু'পায়ে শেকল বেঁধে রাখতে হয়।
ডাক্তার বলেছে ও ঠিক হয়ে যাবে।
আমার মেয়ের জন্য দোয়া করো।
বাদ দাও তোমার ছেলে মেয়ে ক'জন?
জানোতো আমার ডান পাঁ টা এখন অবস্ হাতেও খুব একটা শক্তি নেই।
আমার হয়তো শেষদিন গুলো চলে এসেছে।
তুমি কেমন আমার বুকে লেপটে থেকে আদুরে গলায় বলতে, দেখো শেষদিনগুলো ও এমনে থাকবো আমরা,
আজ দেখো,তুমি নেই। আমি এ সরিয়ে দিয়েছি তোমাকে।
তুমি হয়তো অন্যকারো হাত ধরে সুন্দর দিন গুলো পার করছো।
আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছো কি এতদিনে?
না করে থাকলে ক্ষমা করে দিও।
তোমার থেকে ক্ষমা না পেলে মরেও হয়তো শান্তি মিলবেনা।
আচ্ছা তোমার ঔ বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি স্বভাবটা এখন আর নেইতো!
ঐ যে খুশি হলে সুন্দর করে নাক ঘষার স্বভাবটা?
ভালো থেকো, আমি কেন যানি আর লিখতে পারছিনা।
শুধু বলবো ক্ষমা করে দিও।
ইতি
তোমার পাগলা ঘোড়া।
চিঠিটা উল্টে পাল্টে দেখলাম, আর কোথাও কোনো লেখা নেই। চিঠিটা কেমন ভিজে গেছে।
খেয়াল করলাম, আমি চশমাটা খুলে রেখেছি, আর আমার চোখ দুটো ভিজা, চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমাকে আমি ক্ষমা করেছি অনেক আগেই, প্রকৃতি হয়তো করেনি। তার হিসেব সে কিভাবে নেয়, আমরা কেউ যানিনা।
প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করেনা।
আমার বড় মেয়ে বাসায় এসেছে,নাতনির বয়স দু'বছর। আছল ধরে টানছে,নানুভাই মা ডাকছে,
চিঠিটা খামে ঢুকিয়ে, নাতনিকে কোলে নিয়ে আর একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,
শেষদিন গুলো ভালো থেকো,আমি ভালো আছি।
আর কেবলি একটি দীর্ঘশ্বাস।