22/09/2024
০১.
ছেলেটির বয়স যখন ৫ বছর, বাবা মা'রা গেলেন।
১৬ বছর বয়সে স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দিলো সে, এবং রোজগারের চাপে পড়াশোনা চালালো কারেসপন্ডেন্সে (ঘরে বসে)।
১৭ বছর বয়সের মধ্যেই প্রায় ৪টির বেশি চাকরি হারাতে হলো তাকে, ঠিক সময়মতো কাজে যেতে না-পারায় এবং যোগ্যতার অভাবে।
বিয়ে করলো সে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই।
১৮-২২, এই ৪ বছর সে ড্রাইভারের চাকরি করলো, এবং সেটাও হারালো।
সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে গেলো, প্রত্যাখ্যাত হলো।
আইন পড়লো কারেসপন্ডেন্সেই, স্কুলে গিয়ে পড়ার সময় ও পয়সার তখন অভাব, নানাদিকে কাজ খুঁজছে সে ছুটেছুটে!
ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সেলসম্যানের চাকরি একটা পেলো, হলো ব্যর্থ।
বয়স তখন ২৫, ছেড়ে গেলো স্ত্রী; সাথে নিয়ে গেলো একমাত্র সন্তান কন্যাটিকে।
অবশেষে কফি-শপে টেবিল পরিষ্কারের কাজ নিলো সে।
এরপরের বছরগুলোয়, সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলো সাবেক স্ত্রীর কাছে, বেশ কয়েকবার; ফলাফলে পেয়েছিলো অপমান, তাচ্ছিল্য; পুরোই পর্যুদস্ত যুবক, পেলো না আর কলিজার টুকরাকে ফিরে।
এই আঘাতই ছেলেটিকে জেদি করে দিলো চিরতরে! ১৯৩০ সালে দেখা গেলো─ ইস্টার্ন কেন্টাকির হাইওয়ে টুয়েন্টি ফাইভ-এ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে নিজের রান্না করা গরম খাবার বিক্রি করছেন তিনি। বছর কয়েক পরে ওখানেই তিনি খুলে ফেললেন একটি রেস্তোরাঁ। এবং ১৯৩৭ সালে, এর সাথে যুক্ত করলেন একটি মোটেল!
৬৫ বছর বয়সে এসে, যেদিন তিনি ১০৫ মার্কিন ডলারের প্রথম সরকারি সিকিয়োরিটি চেকটি (অবসর ভাতা) পাচ্ছেন, সেদিন তিনি বিহ্বল! "আমি যদি ৬৫ বছরের বুড়ো না-হতাম, এবং যদি প্রত্যেক মাসে ১০৫ ডলারের সোশ্যাল সিকিউরিটি চেকটি না-আসতো, জানি না, কী করতাম আমি! ওই অবস্থাটির নাম হতাশা নয়, একে আমি বলবো─ দ্বিধা, 'কী করবো আমি' এই সিদ্ধান্তহীনতা।" বহু বছর পরে বলেছিলেন তিনি, তাঁর আত্মজীবনীতে।
০২.
আজীবন ব্যর্থ এই মানুষটি, সেই ১০৫ ডলারের চেকটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন ভয়ানক একটি ভাবনা নিয়ে! 'এই দয়ার পয়সার উপরেই বেঁচে থাকবো বাকিটা জীবন? নাকি, এ-দিয়েই আরম্ভ করবো দুনিয়ায় সফলতম হয়ে ওঠার যাত্রা, এই বুড়ো বয়সেই?
হ্যাঁ, সাধারণ লোকটি বেছে নিলেন ভ'য়ঙ্কর ঝুঁকিটাই।
বন্ধু হারম্যান, যার একটি রেস্তোরাঁ আছে সল্ট লেক সিটিতে, এবং যে-রেস্তোরাঁয় তিন বছর আগেই দারুণ সুস্বাদু ফ্রায়েড চিকেনের একটি রেসিপি রান্নার প্রক্রিয়া শিখিয়ে এসেছেন তিনি, সেই বন্ধুর কথা মনে পড়লো তাঁর। তখনই, হঠাৎ তাঁর মনে হলো─ 'আরে! এতোকিছু করলাম জীবনে, এতো কিছু রেঁধে বেচলাম, কিন্তু একটি কাজ তো করা হয়নি এখনো: দাদির কাছ থেকে শেখা ফ্রায়েড চিকেনের রেসিপিটা, যেটা হারম্যানকে তার রেস্তোরাঁয় বেচার জন্য শিখিয়ে এসেছি, সেটা তো নিজে কখনো বেচলাম না!'
হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন বুড়ো, সরকারের দেওয়া টাকাগুলো পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পার্শ্ববর্তী দুই প্রখ্যাত বাণিজ্যিক রাজ্য ওহাইয়ো ও ইন্ডিয়ানার উদ্দেশ্যে। ওখানকার রেস্তোরাঁর চিকেন-ব্যবসা দেখবেন তিনি। তারপর ফিরে এসে নিজেই আরম্ভ করবেন। কিনে রাখলেন ফ্রাইংপ্যান, আর যাবতীয় সমস্ত অনুষঙ্গ। তিনি আসবেন ফিরে।
হ্যাঁ তিনি ফিরে এসেছিলেন, দুই ব্যস্ত বাণিজ্যিক রাজ্যের রেস্তোরাঁ-ব্যবসার বিকিকিনি দেখেশুনে, অভিজ্ঞতা নিয়ে, সেবছরই। এসেই, চলে গেলেন সল্ট লেক সিটিতে, বন্ধু হারম্যানের রেস্তোরাঁয়। দেখলেন─ ওখানে তাঁর শেখানো রেসিপিটা এখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, স্বাদে! কিন্তু, রেসিপিটা যে তাঁর─ এর কোনো স্বীকৃতি দেয়নি বন্ধু কোথাও! অতএব, সেই ফ্রায়েড চিকেন রেসিপিটা রান্না ও বিক্রির জন্য বন্ধুর সাথে চুক্তি করলেন তিনি, এবং চুক্তি হলো আশেপাশের আরও ৮টি বিখ্যাত রেস্তোরাঁর সাথে, তাঁর রেসিপিটা তাঁরই দেওয়া ব্রান্ড নামে বিক্রি করার অনুমতিতে। এই সেই চিকেন রেসিপি, শৈশবে দাদির রেঁধে খাওয়ানো যে-রেসিপির স্বাদ আজ জিভে লেগে আছে পৃথিবীর সমস্ত খাদ্য-রসিকের, এবং আমাদেরও!
দাদির শেখানো রেসিপির সাথে আধুনিক আরও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া মিশিয়ে তৈরি করা তাঁর নিজস্ব এই খাবারটির স্বাদ ভোলা হবে না, যে খেয়েছে অন্তত একবার─ "finger lickin' good!"...
ফিরে এলেন ভদ্রলোক, কেন্টাকিতে। আরম্ভ করলেন তাঁর দেওয়া নামেরই ব্রান্ডটি, পৃথিবীর খাবারের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি খাবারের ব্রান্ড─ কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন, KFC!
০৩.
৯০ বছর বয়সে, সেই পরিশ্রমী ভদ্রলোক─ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্যান্ডার্স (০৯.১১.১৮৯০-১৬.১২.১৯৮০), কেএফসি (কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন) ফাস্ট-ফুড চেইন শপের প্রতিষ্ঠাতা─ যখন ত্যাগ করছেন এই পৃথিবী, তখন তিনি অর্থের পরিমাপে─ মিলিয়োনিয়ার, মানুষের ভালোবাসার পরিমাপে─ অমর, খাদ্য-রসিকদের কাছে─ কিংবদন্তী।
তথ্যসূত্র─ আত্মজীবনী 'দি অটোবায়োগ্রাফি অভ দি অরিজিনাল সেলিব্রিটি শেফ, হাইওয়ে ২৫' (কেএফসি করপোরেশন, ২০১২)
'কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স: কেএফসি ক্রিয়েটর' (শেইলা গ্রিফিন ল্যানাস, ২০১৪)
'কর্নেল স্যান্ডার্স এন্ড দি আমেরিকান ড্রিম' (জশ ওজারস্কি, বই, ২০১২)
নিউ ইয়র্ক টাইমস
দ্য নিউ ইয়র্কার
এএপি ফ্যাক্টচেক (২০২১)
স্নোপ্স।
পোস্ট সংগৃহীত